প্রিয়জনের সাথে কথোপকথনের সেতুবন্ধন!

95
প্রিয়জনের সাথে কথোপকথনের সেতুবন্ধন! ছবি-গুগল
Print Download PDF

সম্পর্কের গভীরতা নির্ভর করে যোগাযোগের উপর। প্রিয়জনের সাথে রোজ কতক্ষণ কথা হয়? স্বামী/স্ত্রী’র কথা বলার ব্যাকুলতাতে আপনাকে বিপরীতজন কতটুকু পায়? আপনার যদি অবসর না থাকে, মনের কথা যদি আপনাকে শোনানো না যায় কিংবা ভালো শ্রোতা হতে থাকে আপত্তি- তবে আপনি থেকে আর কি হবে? যখন আপনি থাকা না থাকা সমান তখন থাকার চেয়ে বরং না থাকাই শ্রেয়।

রোজ দু’দশ মিনিটেই সব কথা ফুরিয়ে যায়? কিংবা একবারও আগ্রহ ভরে ফোন করে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না? যদি এটুকু সময়েই কথা বলেন তবে সমস্যা নাই কিন্তু প্রিয়জনকে আড়ালে রেখে, স্বামী/স্ত্রী’র অগোচরে একান্ত কথা যদি অন্যকারো সাথে হয় তবে বাদ দিন। প্রিয়জনকে সময় দিন। ব্যস্ততার বাহানায় যে ফাঁকি দিচ্ছেন তা ভয়ঙ্কর হয়ে ফেরত আসবে। কাজের অজুহাতে প্রিয়জনকে উপেক্ষা করবেন না, এর ফল ভয়াবহ হতে পারে।

প্রিয়জনের সাথে বেশি কথা বলার চেয়ে তাকে বেশি শোনা জরুরি। আগ্রহভরা স্রোতা কথকের খুব পছন্দের। সেই কথক যদি জীবন সঙ্গী হয়, সেই শ্রোতাও যদি আগ্রহ দেখায় তবে তো সোনায় সোহাগা। রোজকার কাজে যেসকল কথা জমা হয় তা আপনি শুনতে অনাগ্রহ দেখালে কথার নতুন ঠিকানা তৈরি হয়। দাম্পত্যের যত দূরত্ব সেসবের বেশিরভাগ ঠিক ঠিকানায় কথা না বলা এবং কথা না শোনার জন্যই সৃষ্টি হয়।

সম্পর্কের অভিযোগ, সঙ্গীর অনুযোগের কেন্দ্রে মনোযোগী শ্রোতা না হওয়াই প্রথমত দায়ী। দ্বিতীয় দায় মন খুলে কথা না বলার! কৃপণ মনের ফাঁসি হোক! একটু জোঁক করলাম! মানুষকে দূরে রেখেও ভালো থাকা যায় যদি নিয়মিত কথা হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দূরত্বের জননী। মানুষ দেহের টানের চেয়ে কথার প্রেমে বেশি মুগ্ধ হয়। কথার মোহে বেশি প্রলুব্ধ হয়। মিশে থাকে।

একদিন আমাদের বৃদ্ধ হতে হবে। যৌবনের অবহেলা বার্ধক্যে প্রতিশোধ হয়ে ফেরত আসবে। এখন কথার বীজ বুনে রাখুন। বার্ধক্যে সেই বৃক্ষের ফল ও ফুলোর শোভা পাবেন। সঙ্গীকে ভালো না লাগার দোহাইয়ে এড়িয়ে বাঁচা যায়, অনেকগুলো ভুলভাল অপশনের মধ্যে সঠিক অপশনের সাথে কথা না বলেও পারা যায়। কিন্তু পরিণতি? যখন ভোগ-লোভের কূল খোওয়া যাবে তখন এমন একাকীত্বে ভুগতে হবে যার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। কথা না বলা অপরাধ নয়। তবে সঠিক মানুষকে ঠকিয়ে ভুল মানুষের সাথে আলাপে মজা গুরুতর অপরাধ। ঘোরতর পাপ। কাউকে না জেনে ঠকানো এবং কাউকে জেনে-বুঝে ঠকানো- দু’য়ের মধ্যে বিশাল তফাৎ।

 প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কথার চুক্তি না হলে জীবন চলবে না। সঙ্গী অহেতুক কথাতেও নীরব শ্রোতা হতে হবে। না শুনলেও শোনার ভাণ করতে হবে। যে কথা আপনার জন্য জন্মে সে কথার অপমৃত্যু ঘটলে তা অন্য আত্মায় পাড়ি জমাবে। রূপ দেখে মানুষ সাময়িক সময়ের জন্য মুগ্ধ হতে পারে কিন্তু মানুষকে ধরে রাখতে, মানুষের মনে থাকতে বাক্যালাপের বিকল্প না। শুয়েই ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ কথা হোক। কথাহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাক মুশকিল। আবার ভুল মানুষের সাথে সঠিক কথাও ভুল গল্পের জন্ম দেয়। কথার বন্ধুত্ব- যা মায়াময় হয়। কথা প্রেমে ভালো লাগার উপলক্ষ্য তৈরি হোক।

 সময় পেলেই প্রিয়জনের সাথে কথা বলুন। ব্যস্ততার ফাঁকে অবসর বের করে একটু খোঁজ নিন। কি করছে, খেয়েছে কি-না  কিংবা শরীরের কি কেমন- এসব জানতে চাওয়ায় যে দরদ বাসা বাঁধে তা যে উপলব্ধি করেনি তাকে বোঝানো সম্ভব নয়। একটু একটু বেড়াতে যাওয়া, শখ পূরণের কেনাকাটা করা কিংবা রাত-বিরেতে চা’চুমুকে তর্কে মাতা- এসব সম্পর্কের সৌন্দর্য! কাজ শেষ কাজেই ঘুমাতে চাওয়া আটকে রাখুন। কথা বলুন। কথা শুনুন। অনেক কথা গোপনেও থাকে। আবিষ্কার করুন।

 আকুলিবিকুলি করার কথার মাঝেই স্নিগ্ধতা থাকে। এখন চুপ করে থাকলে কিংবা ভুল পথ বাতলালে পরিণামে আফসোস করতে হবে। কারো সামনে সে দুর্দিন না আসুক- সেই প্রার্থনাতে প্রিয়জনকে যত্নে আগলে রাখুন এবং নিজেদে নিজস্বতার গল্প তৈরি করুন। আপনার যত্নে তৈরি গল্পগুলোই একদিন আপনার বার্ধক্যের সুখস্মৃতি হবে।

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।

raju69alive@gmail.com