অযোগ্য ধনীদের দম্ভ আর শিক্ষিতের সংগ্রাম

0
200
ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে শিখুন। দুঃখ থাকে না চিরকাল। কিন্তু একবার সততা হারিয়ে ফেললে, জীবনের বাকি পথ লজ্জায় মুখ ঢেকেই কাটে। তাই শিক্ষিত, বিবেকবানদের সঙ্গী হোন। যারা অর্থেই সব মাপে, তাদের থেকে দূরে থাকুন। তবেই মন ও মানসিকতায় সুস্থ থাকা যাবে।

অযোগ্য মানুষের হাতে যখন অর্থ আসে, তখন তারা প্রায়শই অসভ্য হয়ে ওঠে। সমাজে দেখবেন, এমন অনেকেই অর্থবিত্তের জোরে নিজেদের সবজান্তা ভাবতে শুরু করে। যেখানে-সেখানে ঢুকতে চায়, যেকোনো বিষয়ে মতামত দিতে চায়, যাকে তাকে অবজ্ঞাসূচক ভাষায় কথা বলে। তখন সে আর শিক্ষিতজনকে মূল্যায়ন করে না, দক্ষ মানুষকে তো গোনাতেই আনে না। অর্থকে যারা মানবিক মূল্যবোধের মানদণ্ড বানায়, তাদের থেকে যতদূরে থাকা যায়, ততই ভালো। কারণ, তারা জানে না কাকে কীভাবে সম্মান দেখাতে হয়। টাকার গরমে এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে ঠিক-বেঠিকের ভেদরেখাটুকুও আর উপলব্ধি করে না।

সমাজে অনেকের হাতে অর্থ থাকবে—শিক্ষিতেরও, আবার অশিক্ষিতেরও। কিন্তু টাকায় শিক্ষার মূল্য নির্ধারিত হয় না। কে কতভাবে ধনী হয়েছে, সেটিই মূল নয়। কারণ আজকাল নগদ কৌশলে বহু অযোগ্য মানুষও প্রতিষ্ঠার মঞ্চে উঠে যায়। কিন্তু খবরদার! শিক্ষিতজন যেন টাকার কাছে মাথা বিকিয়ে না দেয়। একজন অযোগ্যের হাতে যদি হয় দুনিয়ার সব সম্পদ, আর আপনার হাতে থাকে জ্ঞানের আলো—তবু আপনি-ই শ্রেষ্ঠ। কারণ, আপনি অন্তত ঠিক-ভুল বুঝে কথা বলেন, কাজ করেন।

সমাজ হয়তো আজ ধ্বংসপ্রায়। অসৎ পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা ব্যবস্থায় আমরা বন্দি। যারা অর্থকে জীবনের একমাত্র সাধনা বানিয়ে ফেলেছে, তারা অনেক সময়ই অমানুষে রূপ নেয়। আপনি মানুষ হয়ে থাকুন। স্রষ্টার দেওয়া দায়িত্ব সৎভাবে পালন করুন। দুদিনের জীবনে যা কিছু অর্জন করেন, তার কতটুকু-ই বা ভোগ করতে পারবেন? অধিকাংশই হয়তো ভোগ করবে এমন কেউ, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন। তাই জীবনের সত্য কাজগুলো বাকি থাকলে তা পূরণ করুন। অনুকরণীয় হোন, সেইসব মানুষের যারা সম্পদের চেয়ে শিক্ষাকে বড় মনে করে।

কথা উঠলেই যারা নিজের অর্থ বা সন্তানের সম্পদের ঢাক পেটায়, তাদের এড়িয়ে চলুন। কথা বলুন তাদের সঙ্গে, যারা সন্তানকে সত্যিকার অর্থে ‘সম্পদ’ বানাতে পেরেছে। যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, যাদের সঞ্চয় আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক, তাদের কাছে স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করুন—এই সম্পদের উৎস কী? আত্মীয় হলেও যদি আয় অবৈধ হয়, তাকে বর্জন করুন। অর্থ উপার্জন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। সত্য আর সততার পক্ষে দাঁড়ান। প্রয়োজনে একবেলা না খেয়ে থাকুন, তবুও আত্মাকে কলুষিত করবেন না।

হারামের অর্থ শরীরে প্রবেশ করলে, তার বিষ মগজ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠাদের প্রতাপে সৎ মানুষদের অস্তিত্ব টলে ওঠে—তবুও সত্যপন্থীদের লড়তেই হয়। আয় সীমিত হোক, কিন্তু তা হোক স্বচ্ছ। দরকার হলে নিজে খেতে কম খান, তবুও অন্যায় আয়ের প্রতি হাত বাড়াবেন না। আত্মীয়-পরিজন যদি সম্পদের গরম দেখায়, তাদের থেকে মনেপ্রাণে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিন। নয়তো তাদের প্রভাব আপনাকেও নৈতিক বিচ্যুতির পথে টেনে নিয়ে যাবে।

ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে শিখুন। দুঃখ থাকে না চিরকাল। কিন্তু একবার সততা হারিয়ে ফেললে, জীবনের বাকি পথ লজ্জায় মুখ ঢেকেই কাটে। তাই শিক্ষিত, বিবেকবানদের সঙ্গী হোন। যারা অর্থেই সব মাপে, তাদের থেকে দূরে থাকুন। তবেই মন ও মানসিকতায় সুস্থ থাকা যাবে।

অর্থ প্রয়োজন, তবে মূল্যবোধের বিনিময়ে নয়। সমাজে টাকার মানুষের অভাব নেই, কিন্তু সৎ ও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কমছে বলেই নীতিহীনতার ছায়া ঘন হচ্ছে। টাকার মোহে অন্ধ না হয়ে, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়াই প্রকৃত উন্নয়ন। মনে রাখা দরকার—সময় ফুরিয়ে যায়, ধন-সম্পদ বিলীন হয়, কিন্তু শিক্ষিত বিবেক ও সততা মানুষকে মানুষের আসনে বসিয়ে রাখে।

রাজু আহমেদ,  প্রাবন্ধিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here