আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, কমতে থাকা জরুরি তেলের মজুত এবং বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের চাপে নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির আশঙ্কা, নতুন কোনো বড় সংকট দেখা দিলে বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান সহনশীলতার সীমা পরীক্ষা হতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রকাশিত আইএমএফের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এ ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় সীমিত থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার কারণে বাজারে চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে। তবে মজুত কমে আসায় ভবিষ্যতে নতুন ধাক্কা এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
আইএমএফের মতে, জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংকট মোকাবিলার আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কারণ, অনেক দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম আবার বাড়লে ভোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়। পরে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও মজুতের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমএফের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পণ্য ও সেবার দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে সতর্কতার মধ্যেও ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৩ শতাংশ।
২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৪ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে সংস্থাটি।
দেশভিত্তিক পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। তবে ২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় জ্বালানির দাম বেশি থাকলে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বাড়লে ভোগ ও বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি দেখছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে সেই সক্ষমতা সীমার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। তাই নীতিনির্ধারকদের শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকেও নজর দিতে হবে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের চাপ বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া বা আরও তীব্র হয়ে ওঠার কথা উল্লেখ করেছে আইএমএফ। সংঘাত বাড়লে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ ও চরম আবহাওয়াও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগকে ঘিরে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এআই খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণ না হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়ে তার প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়লেই অতিরিক্ত কঠোর নীতি গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
সংস্থাটির মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধির পথে থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরকারি ঋণ ও আর্থিক বাজারের ঝুঁকি একসঙ্গে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। নতুন ধাক্কা মোকাবিলায় তাই আগাম প্রস্তুতি, নমনীয় নীতি এবং আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



