Homeঅর্থনীতিএক বছরে প্রবাস আয় বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ, সামনে নতুন শঙ্কা

এক বছরে প্রবাস আয় বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ, সামনে নতুন শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

দেশে প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এই ধারা ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭.৩০ শতাংশ বেশি।

বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং কর্মীদের কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ প্রবাহকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের ১৬.১৩ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে মোট রেমিট্যান্সে সৌদি আরবের অংশ বেড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ হয়েছে। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের প্রবাস আয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতির কারণে রিয়াদ রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। এ রুটে সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করে এয়ারলাইনসটি। ইতোমধ্যে প্রায় ১১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ঢাকা ও রিয়াদ মিলিয়ে আট থেকে নয় হাজার যাত্রী পরিবহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফ্লাইট চালু হলেও সীমিত স্লটের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৭ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৬ জন সৌদি আরবে গেছেন। অর্থাৎ এ সময়ে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের অর্ধেকের বেশি দেশটিতে গেছেন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ৩৮.৫৩ শতাংশ কমেছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকটময় সময় পার করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাস আয় ও শ্রমবাজারেও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে সীমাবদ্ধতার কারণে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সুযোগ ব্যাহত হলে রেমিট্যান্সে সরাসরি প্রভাব পড়বে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং প্রবাস আয়ের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মীদের আয় কমে যাওয়া, কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রবাস আয় ধরে রাখতে বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করা জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপ ও জাপানের মতো বিকল্প শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায়। তবে সম্ভাব্য প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে আঞ্চলিক সংঘাতের স্থায়িত্ব, রপ্তানি আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর।

এক বছরে প্রবাস আয়ের ১৭.৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও, রেমিট্যান্সের বড় উৎস সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments