Homeঅর্থনীতিব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি: নতুন ঋণ, বিনিয়োগ ও সংস্কারে জোর

ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি: নতুন ঋণ, বিনিয়োগ ও সংস্কারে জোর

তানু রায়হান:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে নতুন ঋণ, অর্থনৈতিক সংস্কার, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এ সভায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে নতুন ঋণ কর্মসূচি বা বিশ্বব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়ন প্যাকেজ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সভা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

সরকারের অন্যতম লক্ষ্য আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ অঙ্ক এখনো প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ে; ঋণের শর্ত, মেয়াদ ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি চূড়ান্ত হয়নি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। নতুন ঋণ চুক্তির বিষয়ে সরকার আশাবাদী। ১৫ অক্টোবর সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পরও তিনি আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানান।

নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ নতুন কর্মসূচির জন্য সংস্থাটির সহায়তা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি জাতীয় বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ বিষয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তির প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়নের পরিমাণ বা পৃথক প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। তাই অর্থায়নের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।

সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে সংগৃহীত অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ অর্থবছরে ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি অর্থায়নসহ মোট সংগৃহীত অর্থায়ন ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আকর্ষণ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ কত অর্থ পাবে বা কোন প্রকল্পে অর্থায়ন হবে, তা এখনো নির্দিষ্ট হয়নি।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা এবং দুই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, তা নিয়েও কথা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিনিয়োগের ধীরগতি, ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতা এবং দক্ষতার ঘাটতি তরুণদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করছে।

সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের তহবিল ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব বিবেচনার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের অর্থায়নকে আলাদাভাবে বিবেচনার কথা বলেন।

জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটকে সমন্বিত পরিচয়ব্যবস্থার আওতায় আনারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনা সহজ হতে পারে।

এদিকে কৃষি খাতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আইএমএফের মতে, শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করা যথেষ্ট নয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতের সংস্কারও প্রয়োজন। দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি বলে জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।

ব্যাংককে অবস্থানকালে থাইল্যান্ডের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য, শিল্প উৎপাদন ও যৌথ উৎপাদনব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানো গেলে স্থানীয় উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়তে পারে।

বৈদ্যুতিক যানবাহন, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পেও থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে। এসব খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে দক্ষ জনশক্তি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংককের বার্ষিক সভাকে বাংলাদেশ নতুন অর্থায়ন সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের নিজস্ব অগ্রাধিকার তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। তবে আলোচনা থেকে বাস্তব সুফল পেতে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments