Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়উৎসবের আলোয় অর্থনীতির নতুন পথ: দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

উৎসবের আলোয় অর্থনীতির নতুন পথ: দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

এস এম মোকতার হোসেন:

একটি উৎসবের মূল্য কি শুধু তার ধর্মীয় আচার, আনন্দ কিংবা মানুষের মিলনমেলায় সীমাবদ্ধ? অর্থনীতির দৃষ্টিতে দেখলে উত্তরটি ভিন্ন। একটি উৎসব মানুষের ব্যয়ের ধরন বদলায়, বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করে, নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করে এবং স্থানীয় উৎপাদনকে সচল করে। বাংলাদেশের দুর্গাপূজাও তেমন একটি উপলক্ষ। প্রতিমা তৈরির কারিগর থেকে পোশাকের দোকানি, ফুলচাষি থেকে পরিবহনশ্রমিক, বহু মানুষের জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত। তাই দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে নয়, দেশের স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, পারিবারিক উদ্যোগ এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর জন্য সারা বছর সমান বিক্রি নিশ্চিত করা কঠিন। উৎসবের মৌসুমে চাহিদা বাড়লে তাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়। দুর্গাপূজার আগে পোশাক, অলংকার, প্রসাধনী, মিষ্টি, ফুল ও সাজসজ্জার সামগ্রীর বিক্রি বাড়তে পারে। মণ্ডপ নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজে যুক্ত হন বিভিন্ন পেশার মানুষ। ফলে উৎসবের অর্থনৈতিক প্রভাব দোকানের বিক্রির হিসাব ছাড়িয়ে শ্রমবাজার ও পারিবারিক আয়ের ক্ষেত্রেও পৌঁছে যায়।

কিন্তু এই সম্ভাবনার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উৎসবের সময় ব্যবসা বাড়লেও তার সুফল সব উদ্যোক্তার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। যাঁদের পুঁজি বেশি, বিপণনব্যবস্থা উন্নত এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী, তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান। অন্যদিকে, ছোট কারিগর ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রায়ই কাঁচামালের উচ্চমূল্য, আগাম অর্থের অভাব এবং পণ্য বিক্রির অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। ফলে উৎসবের বাজার বড় হলেও উৎপাদক পর্যায়ে আয় কতটা বাড়ছে, সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

এই ব্যবধান কমাতে হলে দুর্গাপূজার অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, ন্যায্যমূল্যে কাঁচামাল এবং সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিমাশিল্প, মৃৎশিল্প, তাঁত, শাঁখা, অলংকার ও অন্যান্য হস্তশিল্পকে শুধু মৌসুমি পণ্য হিসেবে দেখলে চলবে না। এসব পণ্যের নকশা, গুণগত মান ও বিপণন উন্নত করে সারা বছরের বাজার তৈরি করা সম্ভব। এতে কারিগরদের আয় যেমন স্থিতিশীল হবে, তেমনি দেশীয় ঐতিহ্যও নতুন প্রজন্মের কাছে টিকে থাকবে।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বাজার এবং নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। তবে অনলাইনে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য শুধু পণ্য প্রদর্শন যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, মূল্য, সরবরাহের সময় এবং অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বিপণন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে উৎসবকেন্দ্রিক ব্যবসা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাতের বিকাশেরও সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী মন্দির, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপ রয়েছে। এসব স্থানকে ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটন আয়োজন গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খাবারের দোকান এবং হস্তশিল্পের ব্যবসা উপকৃত হতে পারে। তবে পর্যটনের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত তথ্যসেবা, আবাসন এবং নিরাপত্তা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার আগে তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।

এই জায়গায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি সরাসরি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। পূজামণ্ডপে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, গুজব কিংবা সাম্প্রদায়িক উসকানি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। এতে শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন না; স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানও ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিবেশ রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ করা নাগরিকদেরও কর্তব্য।

দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহও প্রয়োজন। উৎসবকে ঘিরে মোট কত অর্থ ব্যয় হয়, কত মানুষ কাজ পান, কোন খাতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হয় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কতটা লাভবান হন, এসব বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা থাকা দরকার। অনুমাননির্ভর বড় অঙ্কের হিসাবের পরিবর্তে সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারবেন, কোন খাতে সহায়তা দিলে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টি হবে।

তবে উৎসবের অর্থনীতিকে শুধু বেশি কেনাকাটা বা বেশি ব্যয়ের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। মূল্যস্ফীতি ও সীমিত আয়ের কারণে অনেক পরিবার বাড়তি খরচ করতে পারে না। তাই উৎসবের বাজারে পণ্যের ন্যায্য মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় ব্যবসার পাশাপাশি ছোট দোকানি ও প্রান্তিক উৎপাদকদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।

দুর্গাপূজার আরেকটি শক্তি হলো মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা। পূজার বাজারে বিভিন্ন ধর্মের ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করেন, নানা পেশার মানুষ মণ্ডপ নির্মাণে অংশ নেন, পরিবহনশ্রমিক দর্শনার্থীদের যাতায়াতে সহায়তা করেন। এই বাস্তবতা দেখায়, অর্থনৈতিক জীবন ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। মানুষের কাজ, আয় ও সামাজিক সম্পর্ক একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

সুতরাং দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশের সামনে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দেশীয় কারিগরদের সুরক্ষা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ডিজিটাল বিপণনের প্রসার, ধর্মীয় পর্যটনের উন্নয়ন এবং নিরাপদ উৎসবের পরিবেশ, এই উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পূজার মৌসুমি বাজার স্থায়ী অর্থনৈতিক সুযোগে রূপ নিতে পারে।

একটি উৎসবের সাফল্য শুধু কত আলো জ্বলল, কত মানুষ মণ্ডপে এলেন কিংবা কত পণ্য বিক্রি হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হলো—উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি কত মানুষের জীবিকা সমৃদ্ধ হলো, কত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নতুন সুযোগ পেলেন এবং সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা কতটা শক্তিশালী হলো। দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সেই দৃষ্টিতেই দেখতে হবে। ভক্তি, জীবিকা ও সম্প্রীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই উৎসব বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি কার্যকর শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: সম্পাদক, সিএনএস টুয়েন্টিফোর নিউজ ডট কম

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments