Homeবিবিধটপ ফাইভভিউয়ের প্রতিযোগিতায় তারকাদের খোলামেলা কনটেন্ট, প্রশ্নের মুখে গণমাধ্যমের নৈতিকতা

ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় তারকাদের খোলামেলা কনটেন্ট, প্রশ্নের মুখে গণমাধ্যমের নৈতিকতা

বিশেষ প্রতিনিধি:

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে পাঠক-দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, শেয়ার ও এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় সংবাদমাধ্যমগুলো ক্রমেই ভিডিওনির্ভর কনটেন্টের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় তারকাদের খোলামেলা পোশাক, ব্যক্তিগত মুহূর্ত এবং শরীরকেন্দ্রিক উপস্থাপন কতটা সংবাদমূল্য বহন করে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রথম সারির কিছু গণমাধ্যমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিনোদনমূলক ভিডিও ও ছবি নিয়ে ব্যবহারকারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো কনটেন্টে তারকাদের কাজ, বক্তব্য কিংবা বিনোদনজগতের খবরের চেয়ে পোশাক, শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিগত উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে সংবাদ পরিবেশনের বদলে দর্শকের তাৎক্ষণিক কৌতূহলকে কাজে লাগানোর প্রবণতা বাড়ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ এমন উপস্থাপনার সমালোচনা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী বলেন, অদক্ষ, অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া কার্যক্রম থাকায় এসব বিভাগ এখন প্রশ্নের মুখে। তাঁদের প্রশ্ন, এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশের নির্দেশ কে দিয়েছেন, তা কেউ জানেন না। তাঁদের মতে, এটি দায়িত্বহীনতারই প্রতিফলন হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাদারত্ব বজায় রেখে সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

বিনোদন সংবাদে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পোশাক, সাজসজ্জা, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা জনসমক্ষে তাঁদের উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন নতুন কিছু নয়। কিন্তু এসব বিষয় উপস্থাপনের সময় সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা কোথায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, শিরোনাম কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং ভিডিও সম্পাদনার মাধ্যমে দর্শকের মনোযোগ কোন দিকে নেওয়া হচ্ছে, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু ভিডিও নিয়ে সমালোচকদের অভিযোগ, সেখানে কোনো মডেল বা টিকটকারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড কিংবা খাবার খাওয়ার দৃশ্য দেখানোর আড়ালে তাঁর শরীর ও পোশাককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক উপস্থিতিকে এমনভাবে ধারণ ও সম্পাদনা করা হলে তা বিনোদনমূলক কনটেন্টের সীমা ছাড়িয়ে শরীরকেন্দ্রিক বিপণনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোনো ভিডিওকে অশালীন বা অনৈতিক বলার আগে তার সম্পূর্ণ দৃশ্য, উপস্থাপনার উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে, কোনো কনটেন্টের জনপ্রিয়তা বা ভিউয়ের সংখ্যা থেকেই সেটি প্রকাশের পেছনে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পাঠকের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভিডিওর দর্শকসংখ্যা, শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া কনটেন্টের বিস্তার বাড়াতে পারে। ফলে আকর্ষণীয় শিরোনাম, সংক্ষিপ্ত ভিডিও এবং সহজে দর্শকের নজর কাড়ে, এমন উপস্থাপনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা যদি সংবাদমূল্য, তথ্যের গুরুত্ব এবং ব্যক্তির মর্যাদার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দর্শক শুধু বিনোদন নয়, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও দায়িত্বশীল উপস্থাপনার প্রত্যাশাও করেন।

কোনো ভিডিওর শিরোনাম ও থাম্বনেইল যদি মূল ঘটনার চেয়ে ব্যক্তির শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনে, তাহলে সেটি দর্শকের প্রত্যাশাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আবার ভিডিওর বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিরোনামের অসামঞ্জস্য থাকলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থাও কমতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের ধরন, প্রচারের কৌশল এবং দর্শকদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সম্প্রতি কয়েকজন অভিনেত্রীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো আপত্তিকর ভিডিও ও বিভিন্ন দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরীমনি ও মেহজাবীনকে নিয়ে অনলাইনে প্রচারিত ভিডিও সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সেগুলোর সত্যতা, উৎস এবং ভিডিওতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত উপস্থিতি যাচাই করা জরুরি। সম্পাদিত, বিভ্রান্তিকর কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভিডিওকেও কখনো কখনো বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়।

একইভাবে, কোনো অভিনেত্রী কোনো ভিডিও প্রকাশের বিনিময়ে অর্থ বা কমিশন নিয়েছেন, এমন অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ না থাকলে তা সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রকাশ করা উচিত নয়। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য প্রকাশের অভিযোগ থাকলে সেটি আরও সংবেদনশীল বিষয়। সে ক্ষেত্রে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং তাঁর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি, যাচাইপ্রক্রিয়া এবং দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। কোনো ভিডিও সংবাদমূল্য বহন করছে কি না, উপস্থাপনাটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে কি না এবং শিরোনাম দর্শককে বিভ্রান্ত করছে কি না—প্রকাশের আগে এসব বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে দর্শকদের সমালোচনাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কোনো কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত অভিযোগের বিষয়টি পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। দর্শকদেরও যাচাই না করা ভিডিও বা ব্যক্তিগত দৃশ্য ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

ডিজিটাল যুগে ভিউ ও দর্শকসংখ্যা সংবাদমাধ্যমের নাগাল বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এগুলোই সাংবাদিকতার মান নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি নয়। পাঠকের আস্থা, তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি সম্মান এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের দায়, এসব মানদণ্ডও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ভারসাম্য কতটা বজায় রাখতে পারছে, তা নিয়ে আরও স্বচ্ছতা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments