Homeসারাদেশচট্টগ্রামদীর্ঘ সমুদ্রপথ ও বাড়তি ভাড়ায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ক্রমেই ব্যয়বহুল

দীর্ঘ সমুদ্রপথ ও বাড়তি ভাড়ায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ক্রমেই ব্যয়বহুল

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে আজ থেকে পর্যটকদের ভ্রমণ শুরু হচ্ছে। রাতযাপনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় পর্যটকদের জন্য ভ্রমণের সুযোগ বাড়লেও যাতায়াতের ভোগান্তি ও ব্যয় কমেনি। মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে নাফ নদীর সুবিধাজনক নৌপথ বন্ধ থাকায় পর্যটকদের দীর্ঘ বিকল্প পথে দ্বীপে যেতে হচ্ছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকেও জাহাজ চলাচল করছে।

এতে গত কয়েক বছরে জাহাজের ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, আবাসন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে সাধারণ পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ক্রমেই বিলাসবহুল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, সাবরাং থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা, টেকনাফ থেকে আড়াই ঘণ্টা এবং ইনানী থেকে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। অন্যদিকে, কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে দ্বীপে পৌঁছাতে সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। কখনো কখনো এ যাত্রায় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টাও লেগে যায়।

ফলে ঢাকা থেকে যাওয়া পর্যটকদের যাওয়া-আসা এবং দ্বীপে এক রাত অবস্থান করতে অন্তত তিন দিন সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

ভ্রমণ ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৩ সালে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের সাধারণ শ্রেণির যাত্রীদের রাউন্ড ট্রিপ ভাড়া ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হলে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকায়।

জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছেন, জ্বালানি, শ্রমিকদের মজুরি ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (টোয়াক) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাফ-উদ-দৌলা আশেক বলেন, ‘সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের বর্তমান ভাড়া নিঃসন্দেহে বেশি। তবে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের মজুরিসহ পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। সমুদ্রগামী জাহাজগুলো বছরে মাত্র দুই থেকে আড়াই মাস চলাচল করতে পারে। বাকি সময়ও কর্মীদের বেতন ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করতে হয়। এ রুটে আরও জাহাজ যুক্ত হলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভাড়া কমতে পারে।’

বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করা গেলে যাতায়াতের সময় কমানো সম্ভব হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সেগুলো কার্যকরভাবে চালু করা যাচ্ছে না।

শাহপরীর দ্বীপে বড় জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী জেটি ও পর্যাপ্ত নাব্যতা নেই। সাবরাংয়েও প্রয়োজনীয় জেটি অবকাঠামো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ায় পন্টুন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইনানীর নৌবাহিনীর জেটি থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নয়ন শীল বলেন, ‘পর্যটকবাহী জাহাজের ভাড়া স্থানীয় প্রশাসন নির্ধারণ করে। বিআইডব্লিউটিএ নৌপথের অনুমতিপত্র এবং জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয়। কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটের ভাড়া নির্ধারণে এ সংস্থার কোনো ভূমিকা নেই।’

জাহাজের ভাড়ার বাইরে পর্যটকদের আরও কয়েক ধরনের খরচ বহন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ শতাংশ বিক্রয় কমিশন, জনপ্রতি ১০০ টাকা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ফি, জেটি টোল ও সৈকত ব্যবস্থাপনা ফি।

ঢাকা থেকে নন-এসি বাসে কক্সবাজার হয়ে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে একজন পর্যটকের অন্তত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। খাবার ও ব্যক্তিগত খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

এদিকে, পর্যটন খাতে নীতিগত অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি, দৈনিক পর্যটকসংখ্যার সীমা এবং রাতযাপনের বিষয়ে বছরভেদে সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।

টোয়াকের সাবেক সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্তের কারণে সেন্টমার্টিনের পর্যটন ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমরা দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো এবং নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রাতযাপনের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।’

এ মৌসুমে নতুন জাহাজ যুক্ত হলে ভাড়া কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ রুটে এমভি মালঞ্চ এবং গ্রিন লাইনের একটি জাহাজ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে তাঁদের মতে, দীর্ঘ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানো, বিকল্প টার্মিনাল তৈরি, সমন্বিত ভাড়া নির্ধারণ নীতি প্রণয়ন এবং পর্যটনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ব্যয় ও ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments