https://cns24news.com/

নির্বাচন ঝুলে থাকায় তৃণমূলে কমছে জনপ্রতিনিধিত্ব

প্রকাশের তারিখ: 05 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
নির্বাচন ঝুলে থাকায় তৃণমূলে কমছে জনপ্রতিনিধিত্ব

তানভীর রায়হান:

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিকদের সবচেয়ে কাছের সরকার হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন পরিষদেও ধীরে ধীরে কমছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হওয়ায় চলতি বছরেই এক হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের জায়গায় দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রশাসকরা। ফলে স্থানীয় নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম।

শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদেও দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখন নির্বাচিত প্রতিনিধিশূন্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাময়িক প্রশাসক নিয়োগ বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য হলেও দীর্ঘ সময় নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার পরিচালিত হলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল হয়। স্থানীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণেও সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ কমে যায়।

দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালে সাত ধাপে এসব ইউপির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বড় একটি অংশের নির্বাচনের নির্ধারিত সময়সীমা চলতি বছর শেষ হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের কথা। কিন্তু চলতি বছর বিপুলসংখ্যক ইউপির সেই সময়সীমা পার হয়ে গেলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।

ইসি সূত্র বলছে, শুধু নভেম্বরেই এক হাজার ৮৫০টির বেশি এবং ডিসেম্বরে প্রায় ৮৫০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সময়সীমা শেষ হবে। জানুয়ারিতে দুই থেকে তিন ধাপে প্রায় দুই হাজার ইউপিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে কমিশন।

অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোট না হওয়ায় একটি বড় সময়জুড়ে এসব পরিষদকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই পরিচালনা করতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের কাজ শুধু জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় রাস্তা, ড্রেন, ছোট সেতু, পানি নিষ্কাশন, বাজার ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশনসহ নানা উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইউপি সরাসরি যুক্ত।

নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সাধারণত এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় সেই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের জায়গাটি সীমিত হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক একজন সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তার কাছে ভোটারের সরাসরি জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা থাকে না। ফলে স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও অভিযোগের সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ইউপিতে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোথাও সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক করা হচ্ছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও প্রশাসক ও পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আগস্টে বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুলাদী ও উজিরপুর উপজেলার ১৯টি মেয়াদোত্তীর্ণ ইউপিতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক করা হয়। সেপ্টেম্বরে বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলার ১৫টি ইউপিতেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির নেতা মো. নূরনবী ভূঁইয়াকে প্রশাসক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ১২ নেতানেত্রীকে পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বরগুনার বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার বাউশিয়া ইউনিয়নেও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক করা হয়েছে।

ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জায়গায় প্রশাসক বসানোর পাশাপাশি প্রশাসক বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে—বিশেষ করে যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই বছরের ১৯ আগস্ট ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং তিন শতাধিক পৌরসভার মেয়র, সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। পরে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদেরও অপসারণ করা হয়।

এরপর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন নির্বাচন হয়নি।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে কি না, এ নিয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, দীর্ঘ সময় প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনা সাংবিধানিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত।

তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের জন্য প্রশাসক নিয়োগের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু মাসের পর মাস নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা উচিত নয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সংশ্লিষ্ট আইনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন না করা আইনের ব্যত্যয়।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে কমিশন যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে।

তিনি জানান, আগামী জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনও আয়োজন করা হবে।

তবে ততদিন পর্যন্ত যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে, সেগুলো পরিচালিত হবে প্রশাসকদের মাধ্যমে। ফলে নির্বাচনের সময়সূচি যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার পরিচালনার সময়কাল।

এতে প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের পাশাপাশি তৃণমূলের সরকারব্যবস্থায় ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?