https://cns24news.com/

একটি লাইব্রেরি যখন শহরেরও হয়ে ওঠে

প্রকাশের তারিখ: 05 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
একটি লাইব্রেরি যখন শহরেরও হয়ে ওঠে

তানভীর রায়হান:

একটি লাইব্রেরির সাফল্য কী দিয়ে মাপা যায়? বইয়ের সংখ্যা দিয়ে? সদস্যসংখ্যা দিয়ে? বছরে কত বই ধার দেওয়া হয়, সেই হিসাব দিয়ে? নাকি লাইব্রেরির দরজা দিয়ে প্রতিদিন কত ধরনের মানুষ ঢুকছেন এবং বেরিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে কতটা জ্ঞান, আনন্দ কিংবা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নিয়ে যাচ্ছেন, সেটিই আসল মাপকাঠি?

কানাডার ম্যানিটোবা প্রদেশের উত্তরের শহর থম্পসনে গেলে প্রশ্নটির একটি ভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়।

উইনিপেগ থেকে প্রায় সাত ঘণ্টার পথ। আরও উত্তরে গেলে চার্চিল। নিকেল খনি, বোরিয়াল বন আর দীর্ঘ শীতের এই অঞ্চলের শহর থম্পসন পরিচিত ‘হাব অব দ্য নর্থ’ নামে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি প্রতিষ্ঠান, থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরি।

তবে এটি শুধু একটি লাইব্রেরির গল্প নয়। বরং একটি ছোট শহর কীভাবে একটি লাইব্রেরিকে নিজের করে নিয়েছে এবং একটি লাইব্রেরি কীভাবে ধীরে ধীরে সেই শহরের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, এটি তার গল্প।

শুরুটা ছিল খুব ছোট

১৯৬২ সালে যখন থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির যাত্রা শুরু, তখন এর কোনো বিশাল ভবন ছিল না, ছিল না বিপুল বইয়ের সংগ্রহও। একটি স্কুলের ছোট ঘর ছিল ঠিকানা। মানুষের দান করা মাত্র ৭০০ বই নিয়ে শুরু হয়েছিল কার্যক্রম।

উদ্যোগটি নিয়েছিলেন শহরের কয়েকজন নারী। ‘থম্পসন লেডিস কমিউনিটি ক্লাব’-এর একটি প্রকল্প হিসেবে লাইব্রেরিটির সূচনা।

কিন্তু ছোট উদ্যোগটি খুব দ্রুত মানুষের উদ্যোগে বড় হতে থাকে। মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে বইয়ের সংখ্যা বেড়ে হয় ৩ হাজার ৫০০। সদস্য হন ৫৩২ জন। ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী যুক্ত হন কার্যক্রমের সঙ্গে।

এখানেই হয়তো একটি লাইব্রেরির প্রকৃত শক্তির প্রথম প্রকাশ, ভবন নয়, মানুষ।

ভবন বড় হয়েছে, স্বপ্নও

লাইব্রেরির চাহিদা বাড়তে থাকায় স্কুলের ছোট ঘরটি আর যথেষ্ট ছিল না। ১৯৬৫ সালে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৭ সালে নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। এরপর মানুষের অংশগ্রহণ ও পাঠকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেই ভবনও একসময় ছোট হয়ে আসে। ১৯৭৬ সালে শুরু হয় আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ।

আজকের থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রায় ৩০ হাজার বই। বছরে প্রায় ৬০ হাজার বইয়ের আদান-প্রদান হয়।

কিন্তু সংখ্যাগুলোই এই লাইব্রেরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় নয়।

এর আসল পরিবর্তন ঘটেছে অন্য জায়গায়।

লাইব্রেরি যখন আর শুধু লাইব্রেরি থাকে না

আমাদের প্রচলিত ধারণায় লাইব্রেরি মানে বই, টেবিল, চেয়ার, নীরবতা এবং পাঠক। থম্পসন সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে।

এখানে শিশুদের জন্য বই পড়ার আয়োজন আছে। গল্প বলার অনুষ্ঠান আছে। কারুশিল্প আছে। ফটোগ্রাফি, সেলাই, পাথরে ছবি আঁকা, ব্রেসলেট তৈরি কিংবা যোগব্যায়ামের মতো আয়োজনও হয়। শীতকালে গেমিং ক্লাব, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান, বুনন শেখানো কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মসূচি চলে।

লেখকের বই প্রকাশের অনুষ্ঠান হতে পারে এখানে। শিল্পীর কর্মশালা হতে পারে। কোনো সামাজিক আয়োজনের জন্য ব্যবহার করা যায় মাল্টিপারপাস রুম।

অর্থাৎ, মানুষ এখানে শুধু বই নিতে আসে না। আসে সময় কাটাতে, শিখতে, অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে, নিজের দক্ষতা বাড়াতে কিংবা কোনো সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে।

এই জায়গাতেই একটি লাইব্রেরি একটি শহরের সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

প্রযুক্তিও বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। প্রযুক্তির যুগে লাইব্রেরি নিজেকে বইয়ের মধ্যে আটকে রাখেনি।

কম্পিউটার ও বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ডিভিডি, সিডি ও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের সুবিধাও আছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তি এখানে বইয়ের বিকল্প নয়; বরং জ্ঞানপ্রাপ্তির আরেকটি দরজা।

এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। কারণ ডিজিটাল যুগে পাঠাগারের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণা অনেক জায়গাতেই তৈরি হয়েছে। থম্পসনের অভিজ্ঞতা বরং বিপরীত কথাই বলে। প্রযুক্তি যুক্ত হলে লাইব্রেরির প্রয়োজন কমে না; তার ভূমিকা বদলে যায়।

বই থেকে জীবনের দিকে

থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক শুধু পাঠাভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৬ সালে নিসিচওয়েসিহক ক্রি নেশনের সঙ্গে লাইব্রেরির একটি চুক্তি হয়। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক একটি উদ্যোগ গড়ে ওঠে।

এখানে এসে লাইব্রেরির আরেকটি সম্ভাবনা সামনে আসে, জ্ঞান শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, জীবন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যুক্ত।

একজন মানুষ বই পড়তে পারেন। আরেকজন কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন। কেউ কোনো প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। শিশু কোনো গল্পের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে। একজন লেখক তাঁর বই নিয়ে পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

একটি ছাদের নিচে এতগুলো কর্মকাণ্ড একত্রিত হলে সেটি আর কেবল লাইব্রেরি থাকে না। হয়ে ওঠে কমিউনিটির একটি জ্ঞানকেন্দ্র।

আমাদের লাইব্রেরিগুলো কোথায় দাঁড়িয়ে?

থম্পসনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও কিছু প্রশ্ন রেখে যায়।

আমাদের লাইব্রেরিগুলোতে বই আছে। কোথাও বইয়ের সংখ্যা অনেক। কোথাও ভবনও আছে। কিন্তু পাঠককে বারবার ফিরিয়ে আনার মতো আয়োজন কতটুকু আছে?

একজন শিশু কেন লাইব্রেরিতে যাবে? শুধু বই ধার নিতে?

কেন সেখানে তার জন্য গল্প বলার আয়োজন থাকবে না? কেন সে সেখানে ছবি আঁকবে না? কেন বই পড়ে নিজের মতামত লিখবে না? কেন বিজ্ঞান নিয়ে ছোট কোনো প্রদর্শনী হবে না? কেন স্থানীয় কোনো লেখক এসে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কথা বলবেন না?

লাইব্রেরি যদি শুধু পরীক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের নীরব পড়ার ঘর হয়ে থাকে, তাহলে তার সম্ভাবনার বড় একটি অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।

পাঠাগারে পাঠকের কণ্ঠও থাকা দরকার

একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে বিষয়ভিত্তিক পাঠচক্র। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট বিষয়ের কয়েকটি বই পাঠকের জন্য বাছাই করা যেতে পারে। পাঠ শেষে পাঠক তাঁর মতামত লিখে রাখতে পারেন। পরবর্তী সময়ে সেই মতামত নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এতে পাঠক শুধু বই পড়বেন না, পড়া বিষয় নিয়ে ভাববেনও।

লাইব্রেরি তখন পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা থেকে চিন্তার জায়গায় পরিণত হবে।

আর চিন্তার চর্চাই তো শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে এগিয়ে নেয়।

শহরের স্মৃতিও থাকে লাইব্রেরিতে

থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত তার দীর্ঘ পথচলা।

১৯৬২ সালে ৭০০ বই নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা, সেটি আজ প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে শুধু বই বাড়েনি; বেড়েছে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, কার্যক্রম ও দায়িত্বের পরিধি।

একটি শহরের বেড়ে ওঠার সঙ্গে একটি লাইব্রেরির বেড়ে ওঠা এভাবেই একসময় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।

শহরের মানুষ লাইব্রেরিকে ব্যবহার করে, আবার তাদের অংশগ্রহণেই লাইব্রেরি সমৃদ্ধ হয়।

এটি এক ধরনের সামাজিক চুক্তি, প্রতিষ্ঠানটি মানুষের জন্য, আর মানুষও প্রতিষ্ঠানটির জন্য।

শেষ পর্যন্ত লাইব্রেরি আসলে কী?

সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তরই থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লাইব্রেরি কেবল বইয়ের তাক নয়। কেবল নীরব ঘরও নয়।

একটি ভালো লাইব্রেরি হতে পারে একটি শিশুর প্রথম গল্প শোনার জায়গা, একজন তরুণের নতুন কিছু শেখার জায়গা, একজন প্রবীণের সময় কাটানোর জায়গা, একজন লেখকের পাঠকের কাছে যাওয়ার জায়গা এবং একটি শহরের মানুষের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জায়গা।

থম্পসনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার জন্য সবসময় বড় ভবনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানুষের অংশগ্রহণ, ধারাবাহিকতা এবং নতুন প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সক্ষমতা।

একদিন একটি ছোট ঘরে ৭০০ বই দিয়ে যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি শহরের সামাজিক জীবনের অংশ।

সেখানেই থম্পসন পাবলিক লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি লাইব্রেরির সবচেয়ে মূল্যবান সংগ্রহ বই নয়, তার পাঠক, তার মানুষ এবং তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি।

-গবেষক ও গণমাধ্যম কর্মী।