তানভীর রায়হান:
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তার এ ঘোষণায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে দেশে ফেরার পথ এখনো স্পষ্ট নয়। বরং ঘোষণার পর সামনে এসেছে একাধিক আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন—তিনি কোন নথিতে দেশে ফিরবেন, বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যাবর্তনে কী ভূমিকা রাখবে, ভারতে তার অবস্থানের পরিণতি কী হবে এবং দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে কার্যকর হবে।
রাজনৈতিকভাবে ঘোষণাটি আওয়ামী লীগের জন্য নতুন করে সংগঠন গোছানোর সুযোগ তৈরি করেছে। দলটির ভেতরে অনলাইন যোগাযোগ, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বয় এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের তৎপরতা বাড়ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ডিসেম্বরের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা দেশে ফেরার পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে শেখ হাসিনার ঘোষণা কতটা বাস্তব প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা, আর কতটা দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার রাজনৈতিক কৌশল, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যেও একই ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা উঠে এসেছে। একদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে তার প্রত্যাবর্তন নির্ভর করছে আইনি ও প্রশাসনিক কয়েকটি ধাপের ওপর।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা থাকলে দেশে ফেরার পর তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ ভ্রমণ নথি থাকতে হবে। শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট বা প্রয়োজনীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট না থাকার বিষয়টি সামনে থাকায় দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইনগত এই বাস্তবতা শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণাকে সরল রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের বাইরে নিয়ে গেছে। কারণ তিনি দেশে ফিরতে চাইলেই শুধু বিষয়টির সমাধান হবে না; তাকে কোন নথির ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মনজিল মোরসেদের মতে, সরকার যদি তার ফেরার পথ বন্ধ না করে এবং প্রয়োজনীয় ট্রাভেল কার্ড বা পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে, তাহলে তার দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দেশে প্রবেশের পর তার বিরুদ্ধে থাকা আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতির সুযোগ থাকবে না।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে তার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ বা বন্দি বিনিময়-সংক্রান্ত ব্যবস্থা সরাসরি প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়েও আইনগত জটিলতা রয়েছে।
মনজিল মোরসেদের মতে, শেখ হাসিনা ভারতে বন্দি অবস্থায় নেই। এ কারণে প্রচলিত অর্থে বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে তাকে ফেরানোর বিষয়টি সরল নয়। ভারত তাকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠালে এক ধরনের প্রক্রিয়া হতে পারে। অন্যদিকে, তাকে স্বাভাবিকভাবে দেশে ফিরতে হলে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এ কারণে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও তার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার বিপরীতে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের দেওয়া সাজা আইন অনুযায়ী কার্যকর করা হবে। সরকার তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
সরকারের এই অবস্থানের ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি বা দলীয় প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তিনি দেশে ফিরলে বিমানবন্দরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ এবং বিচারিক প্রক্রিয়াও একই সঙ্গে সামনে আসবে।
ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক আবহ তৈরি করা হচ্ছে, সরকারের বক্তব্য তার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এদিকে শেখ হাসিনার ঘোষণাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন দলটির নেতারা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভায় শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও নির্দেশনা দেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, যেসব জেলা ও সাংগঠনিক ইউনিটে কমিটি নেই, সেখানে কমিটি গঠন এবং অসম্পূর্ণ কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বা কারাবন্দি নেতাদেরও সাংগঠনিক দায়িত্বে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলটির এক যৌথ সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক রোডম্যাপ রয়েছে। নেতাকর্মীদের নিয়ে দলটি আবারও মাঠে নামবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ চলছে। তার দাবি, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানাতে পারেন।
তবে দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত রূপরেখা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রস্তুতি কতটা বাস্তব প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি তৈরি করছে, আর কতটা নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার কৌশল, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, দলীয় প্রধান হিসেবে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা ধরে রাখা এবং সংগঠনকে সক্রিয় রাখার জন্য এ ধরনের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি মনে করেন, দেশে না থেকেও শেখ হাসিনা একটি ঘোষণার মাধ্যমে সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেছেন। মাঠের রাজনীতিতে ঘোষণাটির তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন না ঘটলেও প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে ঘোষণার বাস্তবায়ন না হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার বিশ্লেষণে, শেখ হাসিনার সামনে দেশে ফেরার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।
অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর মনে করেন, আওয়ামী লীগের প্রত্যাশা অনুযায়ী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার প্রক্রিয়াটি বাস্তবসম্মত নয়।
তার মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত আসামি হিসেবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ খুলে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রস্তুতির কার্যকারিতা এবং শেখ হাসিনার ঘোষণার বাস্তব রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা তাকে স্বাগত জানাতে জমায়েত হলে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো পাল্টা কর্মসূচি দিতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে।
এতে বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি, এই দুই অবস্থান একই সময়ে কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা এখন তিনটি আলাদা সমীকরণ সামনে এনেছে। প্রথমত, তিনি কীভাবে বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করবেন; দ্বিতীয়ত, ভারত তার প্রত্যাবর্তনে কী ভূমিকা রাখবে; তৃতীয়ত, দেশে ফিরলে সরকারের ঘোষিত আইনি পদক্ষেপ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে।
এর বাইরে আওয়ামী লীগের জন্যও ডিসেম্বর একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। দলটি যদি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে পারে, তাহলে ঘোষণাটি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন গতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু ঘোষণার বাস্তবায়ন না হলে সেই প্রত্যাশাই উল্টো সাংগঠনিক হতাশায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ঘোষণা এখনো মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান বড় পরিবর্তন আনেনি। তবে তিনি দেশে না থেকেও একটি ঘোষণার মাধ্যমে আবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।
সুতরাং ডিসেম্বরের ঘোষণা এখন আর শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণা নয়। এটি একই সঙ্গে সরকারের আইন প্রয়োগের অবস্থান, ভারতের সিদ্ধান্ত, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি বড় পরীক্ষা। ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফেরার রাজনৈতিক ইচ্ছা আছে কি না, সেটি নয়; বাস্তবে ফেরার পথটি কে এবং কীভাবে খুলবে।