https://cns24news.com/

৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক, বাসের জন্য উপযোগী মাত্র ২৮০

প্রকাশের তারিখ: 07 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক, বাসের জন্য উপযোগী মাত্র ২৮০

তানভীর রায়হান:

রাজধানী ঢাকার সড়ক নেটওয়ার্ক প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। অথচ লেনভিত্তিক বড় বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১২ কিলোমিটার। অর্থাৎ মহানগরের বিপুলসংখ্যক সড়ক বড় বাসের প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কের বাইরে থাকছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই রাজধানীর দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল বাসব্যবস্থা বদলে দিতে বিদ্যমান ৯৮টি সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি মূল রুট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে—যে নগরের সড়কের কার্যকর প্রস্থ দখল, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাতের বাণিজ্য, ছোট যানবাহন ও পণ্য ওঠানামার কারণে প্রতিদিন কমছে, সেখানে চিহ্নিত ২৮০ কিলোমিটার সড়ককে কতটা কার্যকরভাবে বাস চলাচলের উপযোগী রাখা যাবে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) মাঠপর্যায়ের জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মহানগরের সচল ৯৮টি বাস রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর উৎস ও গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা এবং প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত চিত্র ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা হয়েছে।

ডিটিসিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের সবটুকু বাস চলাচলের জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। লেনভিত্তিক বড় বাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে—এমন সড়কই ২৮০ কিলোমিটারের হিসাবে এসেছে। অপেক্ষাকৃত সরু সড়কগুলোতে রিকশা, অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচল করবে।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২৮০ কিলোমিটারকে বাস চলাচলের উপযোগী বলা হয়েছে লেনভিত্তিক বিবেচনায়। যেসব সড়কে বাস চলাচলের মতো পর্যাপ্ত লেন নেই, সেগুলোকে বাসের উপযোগী হিসেবে ধরা হয়নি।

তার মতে, বাস রুট রেশনালাইজেশনের পাশাপাশি কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা না করলে বাসব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না।

তবে নগরবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে সড়কের প্রস্থ এবং বাস্তবে যান চলাচলের জন্য পাওয়া জায়গা এক বিষয় নয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ফুটপাতের ওপর দোকান ও হকার, সড়কের পাশে পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি থামানো, অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অবস্থান এবং পণ্য ওঠানামার কারণে সড়কের একটি অংশ নিয়মিতভাবে দখলে থাকে।

মিরপুরের নিয়মিত বাসযাত্রী আব্দুর রশিদ বলেন, ‘সড়ক বড় না ছোট, সেটা সবসময় বোঝা যায় না। রাস্তার এক পাশে দোকানের মালামাল, আরেক পাশে গাড়ি দাঁড়ানো থাকে। বাস এলে যাত্রী নামানো-ওঠানোর জন্য মাঝসড়কে থামতে হয়। এতে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি দুটোই বাড়ে।’

উত্তরার যাত্রী আমিনা বলেন, ‘একটি বাস নির্দিষ্ট স্টপেজে দাঁড়াবে—এটা এখনো ঠিকভাবে মানা হয় না। একই জায়গায় কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে থাকে। নতুন ব্যবস্থা হলে শুধু কোম্পানি করলেই হবে না, সড়কও ফাঁকা রাখতে হবে।’

দক্ষিণ ঢাকার দোকানদার আমিনুলের মতে, দোকানে মালামাল ওঠানামার সময় রাস্তার পাশে গাড়ি রাখতে হয়। তবে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকলে সড়কের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

বাসচালকদের কাছেও সড়কের ব্যবহারযোগ্যতা বড় বিষয়। মালিবাগের ভিক্টর বাসের চালক আসাদ বলেন, ‘রুট নির্দিষ্ট করে দিলে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমতে পারে। কিন্তু রাস্তা যদি যানজটে আটকে থাকে, তাহলে সময়সূচি মেনে চলা কঠিন হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সব সড়ককে বড় বাস চলাচলের উপযোগী করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ ঢাকার অনেক এলাকায় সড়কের প্রস্থ ঐতিহাসিকভাবেই সীমিত।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, পুরো নগর অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে সব সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, শুধু দখল উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পথচারীসহ বিভিন্ন ধরনের যাতায়াতব্যবস্থাকে পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থাৎ বাস রুট রেশনালাইজেশনের সফলতা শুধু রুটের সংখ্যা কমানো বা নতুন বাস নামানোর ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনা, পার্কিং, পথচারী চলাচল, ছোট যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ এবং নগর পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

জরিপে ২৮০ কিলোমিটার সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, কিছু সড়ক আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। হকার, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক এবং মার্কেট-দোকানের দখলে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমেছে। এসব দখল ও প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বাস চলাচলের উপযোগী সড়কের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জরিপের ভিত্তিতে বিদ্যমান ৯৮টি সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি মূল রুট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, দুর্ঘটনা ও দূষণ কমানোর পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ, ৫২ আসনের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ বলেন, গত দুই বছরে অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে ঢাকার সড়কের বড় একটি অংশ দখল হয়েছে। এর সঙ্গে ভ্যান, ফুটপাত এবং দোকান-মার্কেটের মালামাল ওঠানামার কারণে সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনায় তারা আগ্রহী। এটি বাস্তবায়ন হলে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত খরচ কমার পাশাপাশি মালিকদের আয়ও সুরক্ষিত হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বাসের ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আইন ভঙ্গের দায় কোম্পানির ওপর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অনিয়ম হলে মালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কার এবং বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে সেবা না দেওয়া বা চালকদের আচরণে পরিবর্তন না এলে রুট পারমিট বাতিল করে নতুন কোম্পানি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও রয়েছে।

এদিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে মহানগরের সব বাস মেরামত ও রং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট বাস চলাচল বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। অবৈধ, জীর্ণ, রুট লঙ্ঘনকারী ও পারমিটবিহীন বাস বন্ধে ডিএমপি ও মালিক সমিতিকে রুট ও এলাকাভিত্তিক টিম গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে সভার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বাস রুট রেশনালাইজেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ৯৮টি রুটকে ৩২টিতে নামিয়ে আনা নয়। নতুন রুটগুলো কার্যকর রাখতে সড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল ও পার্কিং বন্ধ, নির্ধারিত স্টপেজ বাস্তবায়ন এবং ছোট যানবাহনের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি।

কারণ কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু হলেও যদি একই সড়কে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড়ায়, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা না করে, ফুটপাত দখলমুক্ত না থাকে কিংবা বাসের জন্য নির্ধারিত লেন কার্যকর না হয়, তাহলে নতুন রুট ব্যবস্থাও পুরোনো বিশৃঙ্খলার নতুন রূপ নিতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ২৮০ কিলোমিটার নিয়ে। প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বড় বাসের জন্য উপযোগী মাত্র ২৮০ কিলোমিটার হলে বাকি সড়কের পরিবহন কাঠামো কী হবে—এ প্রশ্নেরও কার্যকর উত্তর প্রয়োজন।

ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব সড়কে ছোট যানবাহন চলবে। কিন্তু বড় বাসের রুট ও ছোট সড়কের মধ্যে যাত্রীদের নির্বিঘ্নে স্থানান্তরের ব্যবস্থা না থাকলে পুরো নেটওয়ার্ক কার্যকর হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার গণপরিবহনকে আলাদা আলাদা বাস রুট হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বড় বাস, ছোট গণপরিবহন, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ফলে ৯৮ থেকে ৩২ রুটে নামানোর পরিকল্পনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সড়কের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। কাগজে নতুন রুট নির্ধারণ করলেই ঢাকার গণপরিবহনের সংকট কাটবে না; সড়ক দখলমুক্ত রাখা, নির্ধারিত স্টপেজ কার্যকর করা, ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে এই পরিকল্পনার আসল পরীক্ষা।