https://cns24news.com/

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য কতটা

প্রকাশের তারিখ: 07 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য কতটা

তানভীর রায়হান:

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ গত কয়েক বছরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, অবকাঠামো, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ততা বাড়ছে। তবে এই ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বা ঋণনির্ভর সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের উদ্যোগ, তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সব মিলিয়ে সম্পর্কের পরিধি বাড়ছে।

কিন্তু একই সময়ে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিপরীতে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে ওই অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা বেড়ে প্রায় ৮২১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান এখনো বড়। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুফল কতটা ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ।

নভেম্বরের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে কেবল দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও দুই দেশের নিয়মিত আলোচনা কাঠামো পেতে পারে।

এর পাশাপাশি চীনের জিডিআইয়ে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়াকে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের আওতায় সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হওয়ার পর এবার জিডিআইয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করেছে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ নতুন নয়। পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

নতুন করে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নেও চীনের সহযোগিতা এগোচ্ছে। একই সঙ্গে চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে (সিইআইজেড) চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চীনা রাষ্ট্রদূতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিইআইজেডে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পেতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা বিদেশি কোম্পানি আনা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পথে।

চীন প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সহযোগিতা করছে। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং কীভাবে তা এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে দুই পক্ষ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকল্পটির অর্থায়ন, বাস্তবায়ন ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল, এসব বিষয়েও বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে। সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও সফরের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ইউএভি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মধ্যে চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে শুল্ক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ তৈরি করেছে। চীন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রায় সব ট্যারিফ লাইনে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশও এর আওতায় রয়েছে।

তবে শুল্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো আমদানির তুলনায় নগণ্য। এর পেছনে বাংলাদেশের পণ্যের বৈচিত্র্য, বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা, পণ্যের মান, সরবরাহব্যবস্থা এবং চীনা বাজারে বিপণন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও ঋণের পাশাপাশি চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অংশ বাড়ানো।

চীনা অর্থায়নে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে ‘ঋণের ফাঁদ’ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে একক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রকল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ফলাফল বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

কোন প্রকল্পে কত ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সুদের হার কত, পরিশোধের সময়সীমা কী, প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় কত এবং সেই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্প অনুমোদনের আগেই স্পষ্ট করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণ নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হতে পারে এমন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া, যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাবর্তন পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশের উন্নয়ন চাহিদার কারণে বাড়ছে, এমনটা দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বড় ভোক্তা বাজার, অবকাঠামো খাত এবং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল ও সরবরাহব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থনও বেইজিংয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য চীনের বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো সহযোগিতা ও উন্নয়ন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্পর্কটি দুই পক্ষের স্বার্থের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, কৌশলগত সংলাপ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পেও চীনের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই সম্পর্ক থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা। চীনা বিনিয়োগ যেন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বিদেশি ঋণে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

ফলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সাফল্য শুধু কতগুলো চুক্তি বা সমঝোতা হলো, তা দিয়ে মাপা যাবে না। বরং এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থে কতটা বাস্তব সুফল তৈরি করে, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।