বিশেষ প্রতিনিধি:
৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ মোট ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে।
সভা শেষে প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র
একনেকের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।
এর মধ্যে প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার টাকা ব্যয় হবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৩০টি নতুন লোকোমোটিভ কিনবে রেলওয়ে
বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সরকারি অর্থায়ন থাকবে ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
তিন জেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন
সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ৩ হাজার ৭৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পটির পুরো অর্থই সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হবে।
২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
গাজীপুরের সড়ক-নর্দমা-ফুটপাত উন্নয়ন
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণে ২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সরকার দেবে ২ হাজার ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ৩৮৮ কোটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮ ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ উন্নয়নেও ৭৮৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৯ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়ন ২৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
রংপুরে অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বরাদ্দ
রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৯ লাখ ৩ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৯৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮০ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
এ ছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসনে আরও ২১০ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে সরকার ১৬৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশন ৪২ কোটি ৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা দেবে।
নগর অবকাঠামো প্রকল্পে আবার ব্যয় বাড়ল
একনেকের সভায় গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ৩১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ৪ হাজার ৪১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পরবর্তী সংশোধনে ৫ হাজার ৭২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার আরও ১ হাজার ৩১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা যোগ হলো। প্রকল্পটির পুরো অর্থই সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে।
৩৫ বাণিজ্যিক ও ৮ সহায়ক জলযান
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংশোধনে প্রকল্প ব্যয় ৭৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ২ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ৬০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
আরও যেসব প্রকল্প অনুমোদন
ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয় করা চ্যান্সারি ভবন সংস্কার ও আধুনিকায়নে ২১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থ সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে।
পঞ্চগড়ের ভজনপুর থেকে পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণে ২০৩ কোটি ৫২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন করা হয়েছে। এতে ব্যয় ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ৯২৬ কোটি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির মেয়াদ চতুর্থবার বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ১৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রীর মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের একটি প্রকল্পের বিষয়ে একনেককে অবহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল ও খাড়োয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্প রয়েছে।
একনেকের এ সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।