https://cns24news.com/

প্রতিশ্রুতির পাহাড়, বাস্তবায়নে ধীরগতি

প্রকাশের তারিখ: 07 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
প্রতিশ্রুতির পাহাড়, বাস্তবায়নে ধীরগতি

 

বগুড়ার উন্নয়ন থমকে আছে? বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, রেললাইন থেকে নগর পরিবহন—বছরের পর বছর অপেক্ষায় বড় প্রকল্পগুল

বগুড়া প্রতিনিধি:

বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক প্রতিশ্রুতি এসেছে। কখনো বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, কখনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবার কখনো বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন, চার লেনের সড়ক, আধুনিক নগর পরিবহন কিংবা শহরের অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ, —বড় বড় পরিকল্পনায় আশার আলো দেখেছেন জেলার মানুষ। কিন্তু প্রতিশ্রুতির সেই তালিকা যত দীর্ঘ হয়েছে, বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি ততটা চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ বগুড়াবাসীর।

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন, নওগাঁ-বগুড়া চার লেন সড়ক, বগুড়া সিটি বাস সার্ভিস, মেট্রোরেলের আদলে শহরের অভ্যন্তরীণ রেললাইন, শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক খেলা ফেরানো, বিসিক শিল্প পার্ক, বগুড়া ফুটবল স্টেডিয়াম, শহরের সড়ক উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসি ক্যামেরা স্থাপন—এমন বহু পরিকল্পনা ও দাবিকে ঘিরে বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে।

এর মধ্যে বগুড়া বিমানবন্দরকে ঘিরে কিছু অবকাঠামোগত কাজ দৃশ্যমান হলেও অন্য বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে স্থানীয়দের অনেকের কাছে ‘এই হবে, সেই হবে’ ধরনের প্রতিশ্রুতি এখন আর আগের মতো আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে না। বরং দীর্ঘ অপেক্ষা ও বাস্তবায়নের ধীরগতিতে হতাশা বাড়ছে।

বগুড়াবাসীর একটি বড় অংশের অভিযোগ, গত দুই দশকে জেলার সম্ভাবনার তুলনায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। দেশের উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে বগুড়ার যে অবস্থান, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো, শিক্ষা, শিল্প, ক্রীড়া ও নগর পরিবহনে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিলেন তারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, উন্নয়নের ঘোষণা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন সীমিত।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব বক্তব্যকে জনমতের বৈজ্ঞানিক জরিপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারপরও ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ ও প্রত্যাশার প্রকাশ স্থানীয় মানুষের অসন্তোষের একটি ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বগুড়া সিটি করপোরেশন হওয়ার পর শহরের মানুষ নতুন করে প্রত্যাশা করেছিলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত সড়ক, ফুটপাত, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক পরিবহন ও নিরাপদ নগরব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

কিন্তু শহরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, ফুটপাত ও যানজট ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো অভিযোগ রয়েছে। ফুটপাত দখল, সড়কের ওপর অবৈধভাবে যানবাহন রাখা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাপ এবং অপরিকল্পিতভাবে যান চলাচল নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থার অভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সড়কে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও নগরীর সর্বত্র কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

উন্নয়নের পাশাপাশি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও মাদক কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে অপরাধের প্রকৃত প্রবণতা নির্ধারণে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার ওপর নির্ভর না করে পুলিশের মামলা, অপরাধ পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বড় বড় প্রকল্পের পরিকল্পনার পাশাপাশি শহরের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যাগুলো কতটা সমাধান হচ্ছে।

ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, সড়কের অবৈধ দখল নিয়ন্ত্রণ, যানজট কমানো, অটোরিকশা ব্যবস্থাপনা, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেনেজ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো নাগরিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে বড় উন্নয়ন প্রকল্পের সুফলও সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে না বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা।

বগুড়া সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের বাজেট ও উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব অর্থের বিপরীতে নগরবাসীর প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—বরাদ্দের কত অংশ কোন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে, কতগুলো প্রকল্প শেষ হয়েছে, কতগুলো চলমান এবং কোন প্রকল্প কতদিন ধরে আটকে আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়, অগ্রগতি, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, সময়সীমা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর পরিকল্পনা বা প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থাও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার।

প্রতিশ্রুতি নয়, এখন বাস্তবায়নের হিসাব চান মানুষ

বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা এখন শুধু নতুন কোনো প্রকল্পের ঘোষণা নয়; বরং ঘোষিত প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি ও সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য।

কোন প্রকল্প অনুমোদিত, কোনটি অর্থায়নের অপেক্ষায়, কোনটির টেন্ডার হয়েছে, কোনটি নির্মাণাধীন এবং কোনটি এখনো কাগজে—এই পার্থক্য পরিষ্কার হওয়া জরুরি। কারণ একটি প্রকল্পের ঘোষণা আর বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়।

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগ থেকে চার লেন সড়ক, শিল্প পার্ক থেকে আধুনিক নগর পরিবহন, প্রতিটি পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।

সেই প্রত্যাশা পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জবাবদিহি, সময়সীমা এবং দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।

বগুড়াবাসীর প্রশ্ন তাই একটাই, আর কত প্রতিশ্রুতি নয়, কবে বাস্তবে বদলাবে বগুড়া?