https://cns24news.com/

বাস হারাচ্ছে শ্রমিক, রিকশায় বাড়ছে নির্ভরতা

প্রকাশের তারিখ: 09 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
বাস হারাচ্ছে শ্রমিক, রিকশায় বাড়ছে নির্ভরতা

তানভীর রায়হান:

ঢাকার গণপরিবহনে দীর্ঘদিনের সংকট ছিল যানজট, অনিয়মিত বাস চলাচল ও যাত্রীভোগান্তি। এখন এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চালক-সহকারীর সংকট। বাস আছে, রুট আছে, যাত্রীও আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস চালানোর মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক নেই। ফলে মালিকদের একটি অংশ বাস রাস্তায় নামাতে পারছেন না, আর যেসব বাস চলছে সেগুলোও প্রয়োজনীয় কর্মী সংকটে পড়ছে।

এর বিপরীতে শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত দ্রুত বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার উপস্থিতি। নিবন্ধন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কারণে এর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ কঠিন হলেও সংশ্লিষ্ট গবেষকদের হিসাবে ঢাকায় এ ধরনের রিকশার সংখ্যা লাখ লাখ। শ্রমিকদের একটি অংশ বাসের চাকরি ছেড়ে এ পেশায় আসায় প্রশ্ন উঠছে, এটি কি শুধু অনিয়ন্ত্রিত রিকশা বৃদ্ধির ঘটনা, নাকি ঢাকার পরিবহন শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বিতীয়টিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাসে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত আয়
বাসশ্রমিকদের বড় অংশের কাজের ধরন দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মিত। যানজটের কারণে একটি ট্রিপ শেষ করতে যেখানে কয়েক ঘণ্টা চলে যায়, সেখানে দিনের শেষে আয় নির্ভর করে মোট ট্রিপ, মালিকের জমা এবং বিভিন্ন পরিচালন ব্যয়ের ওপর।

ফলে একজন চালক বা সহকারীকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকার পরও প্রত্যাশিত আয় না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থায় যানজটের কারণে ট্রিপ কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে শ্রমিকের আয়ে।

অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা অনেকটাই চালকের নিজের নিয়ন্ত্রণে। সকালে বের হয়ে দুপুরে কাজ বন্ধ করা যায়, আবার প্রয়োজন হলে রাত পর্যন্ত চালানো যায়। প্রতিদিনের আয়ও হাতে আসে নগদে।

এ পার্থক্যই অনেক শ্রমিককে পেশা বদলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
ভিক্টর বাসের চালকের এক সহকারি আব্দুল করিম বলেন, আমরা কেন বকাঝকা খাবো। এর চেয়ে আমাদের নিজেদের ব্যবসা করলেও ভালো হয়। বাসচালকরা তো খুব গালিগালাজ করে। তাই আমাদের নতুন গন্তব্য হওয়া উচিত অটোরিকশা চালানো। এতে পরিশ্রম খুব কম, টাকা পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি।

‘চাকরি’ বনাম ‘নিজের কাজ’
বাসের চালক বা সহকারী হিসেবে কাজ করলে নির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট সময়সূচি, মালিকের জমা এবং বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলতে হয়। রিকশাচালকের ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম।

একজন চালক চাইলে কয়েক ঘণ্টা চালিয়ে বিরতি নিতে পারেন। আবার বেশি আয় করতে চাইলে দীর্ঘ সময়ও রাস্তায় থাকতে পারেন। নিজের রিকশা থাকলে মালিকানার সুবিধা রয়েছে; ভাড়ায় চালালেও প্রতিদিনের হিসাব তুলনামূলক সহজ।

এ কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু নিম্নআয়ের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান নয়, বরং পরিবহন শ্রমিকদের কাছেও এক ধরনের ‘স্বাধীন কর্মসংস্থান’ হিসেবে আকর্ষণ তৈরি করেছে।

তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতাও রয়েছে। অধিকাংশ চালকের স্থায়ী চাকরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সামাজিক নিরাপত্তা বা অবসর সুবিধা নেই। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও সীমিত।

অর্থাৎ বাস থেকে রিকশায় যাওয়া শ্রমিকরা এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে অন্য ধরনের অনিশ্চয়তায় প্রবেশ করছেন।
বাস মালিকদের সামনে নতুন সংকট
চালক ও সহকারী না পাওয়ায় বাস মালিকদের ওপরও চাপ বাড়ছে। একটি বাস রাস্তায় নামানোর জন্য শুধু গাড়ি ও রুট পারমিট থাকলেই হয় না; প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চালক, সহকারী এবং পরিচালন কর্মী।

শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক বাস পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা।

বিহঙ্গ বাস চালক কাইয়ুম বলেন, আমরা হেলপার বলতে কয়েক মাস যাবত কাউকে পাচ্ছি না কারণটা কি বুঝিনা। আর সহকারি প্রয়োজন তবে কন্টাকটাররা সবকিছু করে থাকেন।

এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মালিকদের ওপর থাকবে না। বাসের ট্রিপ কমলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়বে, একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট রুটে গণপরিবহনের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
ফলে বাস শ্রমিকের পেশা পরিবর্তনের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নগর পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

রিকশার আয় কি আসলেই বেশি?
ব্যাটারিচালিত রিকশায় দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি আয় করার কথা অনেক চালক ও মালিক বললেও এটি নিট আয় নয়। রিকশার মালিকানা, দৈনিক ভাড়া, ব্যাটারি চার্জ, গ্যারেজ, স্থানীয় চাঁদা এবং অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত আয় কমে আসে।

তবু শ্রমিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিদিন হাতে থাকা নগদ অর্থ।
বাসে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর মাসিক আয় বা দৈনিক পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। রিকশায় কয়েক ঘণ্টা চালানোর পরই আয় হাতে আসে। দরকার হলে পরদিন বেশি সময় কাজ করে আয় বাড়ানোর সুযোগও থাকে।

এই নগদ আয়ের বৈশিষ্ট্যটি নিম্নআয়ের শ্রমিকদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা কি শ্রমিকদেরও টানছে?

রিকশার আরেকটি বড় আকর্ষণ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের তুলনামূলক দুর্বলতা। বাসকে নির্দিষ্ট স্টপেজ, রুট, ট্রাফিক আইন ও পরিচালন কাঠামোর মধ্যে চলতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।

অনেক রিকশা প্রধান সড়কে উঠে আসছে, যেখানে তাদের চলাচলের অনুমতি বা বৈধতার প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নেই, কোথাও নির্দিষ্ট রুট নেই। ফলে একদিকে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কাছে এটি কঠোর নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি পেশা হিসেবে আকর্ষণ তৈরি করছে।

রাশিদুল নামের পরিবহন শ্রমিক নেতা বা ট্রাফিক বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, বাস ও রিকশার নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পার্থক্য কীভাবে শ্রমিকদের পেশা পরিবর্তনে প্রভাব ফেলছে
বাস শ্রমিকদের কাজের পরিবেশও বড় কারণ

পেশা পরিবর্তনের আলোচনায় শুধু আয়কে সামনে রাখলে সংকটের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বাসচালক ও সহকারীদের কর্মপরিবেশও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের মুখে।
দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকা, প্রচণ্ড গরমে কাজ করা, অনিয়মিত খাবার ও শৌচাগার ব্যবহারের অসুবিধা, এসব কারণে পেশাটি অনেক শ্রমিকের কাছে শারীরিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। একজন শ্রমিক যখন দীর্ঘ সময় কাজ করেও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মতো আয় করতে পারেন না, তখন একই দক্ষতা দিয়ে তুলনামূলক বেশি আয় করার সুযোগ পেলে পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া তার কাছে অস্বাভাবিক নয়।

দক্ষ শ্রমিক হারালে ক্ষতি কার?
বাসচালক তৈরি করা সহজ নয়। একটি ভারী যানবাহন নিরাপদে পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং নির্দিষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন। একজন দক্ষ চালক বাস ছেড়ে রিকশায় গেলে শুধু একজন শ্রমিক কমে না; পরিবহন খাত একজন প্রশিক্ষিত কর্মীও হারায়।

অন্যদিকে নতুন শ্রমিক দিয়ে দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
ফলে বর্তমানে যে বিষয়টি বাস মালিকের ‘কর্মী সংকট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটি গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষ মানবসম্পদ সংকটে রূপ নিতে পারে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোতাহার হোসেন বলেন, দক্ষ বাসচালক কমে গেলে নিরাপত্তা ও গণপরিবহন সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বাড়ে।

রিকশা নিয়ন্ত্রণ করলেই কি শ্রমিক ফিরবে?
সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে জোন, নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড ও পারমিট ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলছে। প্রধান সড়কে এ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হলে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কিন্তু শুধু রিকশার চলাচল সীমিত করলেই বাসে শ্রমিক ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ শ্রমিকরা যে কারণে বাস ছেড়েছেন, সেই কারণগুলো যদি থেকে যায়, তাহলে তারা অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার পথ খুঁজবেন। রিকশা বন্ধ হলে নির্মাণ, ডেলিভারি, ভ্যান, ছোট যান বা অন্য অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তাই সমস্যার সমাধানকে কেবল ‘রিকশা নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখলে মূল সংকটটি অমীমাংসিত থেকে যাবে।

বাস খাতের সংস্কার এখন জরুরি
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস খাতকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকের আয় ও কর্মপরিবেশকে পরিবহন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে।

নির্ধারিত বেতন, কর্মঘণ্টার সীমা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে বাস চালানো আবারও শ্রমিকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।

একই সঙ্গে বাস পরিচালনায় রুটভিত্তিক বা ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক কাঠামো কার্যকর করা গেলে মালিক-শ্রমিকের আয় নির্ভরতার ধরনও বদলানো সম্ভব হতে পারে।

ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ছে, এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু এর আড়ালে যে শ্রমবাজারের পরিবর্তন ঘটছে, সেটি তুলনামূলক কম আলোচিত।
একদিকে বাস শ্রমিকরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত আয় ও কঠিন কর্মপরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। অন্যদিকে রিকশা তাদের দিচ্ছে দ্রুত নগদ আয় এবং নিজের সময় নির্ধারণের সুযোগ।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে দুটি সমান্তরাল কাজ জরুরি, সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বাস পরিবহনকে শ্রমিকবান্ধব পেশায় পরিণত করা।

কারণ শুধু রিকশা সরিয়ে দিলে বাসের চালক ফিরে আসবেন না। তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে বাসে এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন চালক দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পরও ন্যায্য আয়, বিশ্রাম, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেখবেন।

ঢাকার গণপরিবহনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু নতুন বাস, নতুন সড়ক বা নতুন অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে না। এর বড় একটি অংশ নির্ভর করছে—একজন চালক কোন পেশায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন, সেই সিদ্ধান্তের ওপর।