https://cns24news.com/

রোবটের সঙ্গে রোবটের ফুটবল, নিজে চলে গাড়ি,মানারাতে স্টেম ফেস্ট

প্রকাশের তারিখ: 16 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
রোবটের সঙ্গে রোবটের ফুটবল, নিজে চলে গাড়ি,মানারাতে স্টেম ফেস্ট

নিজস্ব প্রতিনিধি:

একটি রোবট খেলছে আরেকটি রোবটের সঙ্গে ফুটবল। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট রেখা অনুসরণ করে নিজে নিজেই চলছে ছোট্ট রোবট-গাড়ি। শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি এমন সব উদ্ভাবনী প্রকল্পে মুখর রাজধানীর মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (এমডিআইসি) ক্যাম্পাস। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ করে দিতে প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘MDIC STEM FEST 2026-27’।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে শুরু হওয়া এ উৎসবে রাজধানীর ৮৭ থেকে ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীল চিন্তা, উদ্ভাবনী দক্ষতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে মানারাত ক্লাবস ফর কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের (এমসিসিএ) অধীনে এ আয়োজন করা হয়েছে।

উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও মানারাত ট্রাস্টের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল আলম। এ ছাড়া বিভিন্ন শাখার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও আয়োজক কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

রোবট দিয়ে ফুটবল, নিজে চলে গাড়ি

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবট ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প। মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ-লেভেল দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তাহিয়াদ ইসলাম তৈরি করেছে ‘রোবো সকার’। এ রোবট দিয়ে ফুটবল খেলা যায়। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় দুটি রোবট একে অপরের বিপক্ষে খেলবে।

তাহিয়াদ জানায়, রোবট তৈরি করতে তার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ভবিষ্যতে রোবটটিকে আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

অন্যদিকে, একই প্রতিষ্ঠানের এ-লেভেল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহদী হাসান তৈরি করেছে ‘লাইন ফলোয়িং রোবট’। গাড়ির মতো দেখতে এ রোবটটি নির্দিষ্ট রেখা অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে। প্রকল্পটির মাধ্যমে রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় চলাচল প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে ধরেছে সে।

শিক্ষার্থীদের এসব উদ্ভাবনী প্রকল্প ঘুরে দেখেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব ও অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল আলম। তাঁরা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন কিছু তৈরির প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করেন।

রোবট তৈরির মতো হাতে-কলমে কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগই দিচ্ছে না, বরং নিজেদের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তৈরি করছে।

গণিত থেকে রোবোটিকস, নানা প্রতিযোগিতা

স্টেম ফেস্টে রোবোটিকসের পাশাপাশি গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ ছাড়া আয়োজন করা হয়েছে মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম, প্রকল্প প্রদর্শনী ও ট্রেজার হান্ট।

প্রথম দিন সকাল ৯টায় তৃতীয় শ্রেণি থেকে এ-২ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াডের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং সপ্তম শ্রেণি থেকে এ-২ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জীববিজ্ঞান ও রসায়ন অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয় রোবোটিকস ও মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম। বেলা আড়াইটায় ট্রেজার হান্ট এবং বিকেল সাড়ে ৩টায় পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজকদের মতে, এ উৎসবের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নির্বাচন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিনির্ভর চিন্তা, দলগত কাজ এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।

বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় জরুরি

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ওপর মানবসভ্যতার সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, আবিষ্কার ও গবেষণার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বিজ্ঞান শুধু নতুন কিছু আবিষ্কারের মাধ্যম নয়, এটি নিয়মতান্ত্রিক চিন্তা ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া। মহাকাশ গবেষণা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের অগ্রগতি মানুষের সামনে অজানা বিষয় জানার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে। বৈজ্ঞানিক সাফল্য মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, তবে সেই জ্ঞান মানবকল্যাণে প্রয়োগের মানসিকতা না থাকলে প্রকৃত সুফল নিশ্চিত হয় না।

পরিবেশবিজ্ঞান, জলবায়ুবিদ্যা ও আবহাওয়াবিদ্যাসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

মানারাতের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে উপাচার্য বলেন, তাঁদের নিরলস পরিশ্রম ও অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিতি লাভ করেছে। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

‘মানারাত থেকে একদিন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী তৈরি হবে’

মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল আলম বলেন, এবারের উৎসবে ৮৭ থেকে ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক প্রতিযোগীর অংশগ্রহণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের প্রতিফলন।

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে একদিন মানারাত থেকে একজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পাবেন। আসুন আমরা তার জন্য প্রার্থনা করি এবং তার জন্য স্বপ্ন দেখি। আর এর জন্য আমাদের এখন থেকেই শুরু করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত সংযুক্ত ও পারস্পরিক নির্ভরশীল। তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাও প্রয়োজন। গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং উদ্ভাবনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

শেখার আনন্দই হোক সাফল্যের ভিত্তি

স্টেম ফেস্টের আহ্বায়ক ও মানারাত সায়েন্স ক্লাবের ইনচার্জ ড. মো. মাকসুদুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহশিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা শুধু প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনই নয়, বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা এবং নিজেদের জ্ঞানকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করার মানসিকতা অর্জন করুক।’

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, উত্তরা শাখার অধ্যক্ষ ড. মো. মোশারফ হোসেন; মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, গুলশানের ভাইস প্রিন্সিপাল মো. আনোয়ারুল করীম ও অধ্যাপক তাহমীনা ইয়াসমীন; বালক শাখার কো-অর্ডিনেটর মহসিন কোরায়শী এবং স্টেম ফেস্টের বালিকা শাখার আহ্বায়ক রোকসানা খানমসহ অন্যরা।

উৎসবের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে ডেইলি অবজারভার, আমার দেশ, ডেইলি ক্যাম্পাস ও আগামীর সময়।

দ্বিতীয় দিন শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অলিম্পিয়াড, মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শনীর আয়োজন রয়েছে। দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত হবে ট্রেজার হান্ট। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুই দিনব্যাপী এ উৎসব।

মানারাতের স্টেম ফেস্টে শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবট ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ির মতো প্রকল্পগুলো বিজ্ঞান শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু তৈরির সাহস, হাতে-কলমে শেখার সুযোগ এবং ভবিষ্যতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ বাড়াতে পারে।