https://cns24news.com/

ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চক্রে জিম্মি রাষ্ট্রসংস্কার: টিআইবি

প্রকাশের তারিখ: 17 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চক্রে জিম্মি রাষ্ট্রসংস্কার: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিনিধি:

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রসংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থের চক্রে আটকে পড়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, রাষ্ট্রসংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত দুর্বলতা এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের কাছে আপস করার কারণে সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত ভিত্তি তৈরি হয়নি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এতে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রসংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটও জনস্বার্থে সংস্কারে সহায়ক ভূমিকার পরিবর্তে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

টিআইবির অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার বেশ কয়েকটিকে আইনে পরিণত করলেও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগ বাদ পড়েছে বা বাতিল করা হয়েছে। বিপরীতে, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ায় এমন বিধানগুলো কার্যকর করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে সরকার সংস্কারের বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। একইভাবে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না করে আগের আইনে ফিরে যাওয়ায় কমিশনের প্রতি জনআস্থা তৈরির সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত নতুন আইন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, আইনটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

বিবৃতিতে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে উদ্যোগের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। টিআইবির দাবি, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে এ ধরনের চর্চার দৃশ্যমান প্রতিফলন নেই।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির প্রবণতা নতুন করে বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মানসিকতা রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, অতীতে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিণতি ভোগ করার পরও রাজনৈতিক দলগুলো এত অল্প সময়ের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে ভুলে গেল।

টিআইবি বলছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ওই ঐকমত্যের চেতনা ধরে রাখা প্রয়োজন।

এ জন্য রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দলকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।