তানভীর আহমেদ:
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের এক বছর পরও জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন পদ্ধতিগত বিরোধ ও রাজনৈতিক অনাস্থার মধ্যে আটকে পড়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল এতে। কিন্তু সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতবিরোধ সংস্কার কার্যক্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এই বিরোধের জেরে সংসদের বাইরে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বিরোধীরা।
জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি কিংবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর করে। তবে কয়েকটি বিষয়ে দলগুলোর ভিন্নমত ছিল। পরে ১৯ অক্টোবর গণফোরাম এবং চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর করে।
সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।
কিন্তু নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পরই এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত শপথ নেননি। দলটি বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ওই শপথ গ্রহণ করেন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
ফলে গণভোটের ফল কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হলেও প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়ে তারা এতে যোগ দেয়নি।
কমিটি ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দল, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রস্তাবগুলো পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া এ প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সরকার জুলাই সনদের সব প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের সবটাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব।” এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আরও হবে বলে জানান তিনি। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান চিফ হুইপ।
তিনি বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা আলোচনায় অংশ নিলে সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতো।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি গণভোটের রায় ও জনগণের মতামতকে সম্মান করলে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিত।
তিনি বলেন, সরকার বাস্তবায়নে আগ্রহী না হলে বিরোধী দলের আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া আর কী করার আছে?
জুলাই সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব ছিল। বিএনপির আগে এসব বিষয়ে আপত্তি না থাকলেও ক্ষমতায় আসার পর কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বর্তমান সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে মাত্র একটিতে বিরোধী দলের একজন সদস্যকে সভাপতি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করেছে সরকার। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়েও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রসঙ্গে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দেয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্মতিতে তা কার্যকর হয়। এ প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষই যুক্ত থাকায় পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রতিবেদনে কমিশনের ধারণার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের অভিযোগ, সনদ প্রণয়নের সময় যেসব প্রস্তাবে বিএনপির আপত্তি ছিল না, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোর কিছু বিষয়ে দলটি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আখতার হোসেন বলেন, সনদ প্রণয়নের সময় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এক বছর পরও তা অর্জিত হয়নি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। তাদের বক্তব্য, সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গণভোটে নির্ধারিত বাস্তবায়নপদ্ধতির বিকল্প হতে পারে না।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, জনগণের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। এ দাবি আদায়ে প্রয়োজনে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে বলেও তারা জানিয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম মনে করেন, গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত বাস্তবায়নপদ্ধতি অনুসরণ না করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়ার শামিল। তবে ১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমার মধ্যে বিএনপি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক অবশ্য সনদ স্বাক্ষরকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সব বিষয়ে ঐকমত্য না হলেও সনদ নির্বাহী বিভাগ, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে গণভোটের পর সংসদ ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তা সনদের চেতনার সঙ্গে বেশি সংগতিপূর্ণ হতো বলে মনে করেন তিনি।
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, সনদ স্বাক্ষরের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এক বছর পরও তা পূরণ হয়নি। বরং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
সনদ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক নেতারাও।
কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের অঙ্গীকার ও আগ্রহ দেখে কমিশন এবং নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হবে। বিভিন্ন দলের মতামত নিয়ে আলোচনা শেষ করে নির্বাচনের পথ সুগম করাও ছিল কমিশনের উদ্যোগের অংশ।
কিন্তু এক বছর পরও সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “সংস্কার বাস্তবায়ন শ্লথগতিতে এগোচ্ছে, এটুকু বলতে পারলেও আমি এক অর্থে আনন্দিত হতাম। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই দেখতে পাচ্ছি না।”
তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয়, জনগণের মতামত চাওয়া এবং সেই মতামতকে সম্মান করার বিষয়টিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য বদিউল আলম মজুমদারও সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকাকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর অভিযোগ, গণভোটে অনুমোদনের পরও সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অতিরিক্ত শপথ নেননি এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।
সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন এবং সীমিত পরিসরে প্রস্তাব বিবেচনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দল, উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
সংসদের ভেতর থেকেই সমঝোতার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে একটি সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ এখন সেই সমঝোতার কার্যকারিতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব পাস করার পাশাপাশি সেগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা। আর বিরোধী দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি আদায়ে এমন পথ খুঁজে বের করা, যাতে সংস্কারপ্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ অচলাবস্থায় না পড়ে।
দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা বাস্তব সংস্কারে রূপ নেওয়ার বদলে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেই আটকে থাকার আশঙ্কা বাড়বে।