নিজস্ব প্রতিনিধি:
মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশের বিমা খাতে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনায় বেনামে, ছদ্মনামে কিংবা কাল্পনিক পরিচয়ে বিমা পলিসি খোলা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেনের তথ্য সংস্থাটিকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
সোমবার দেশের সব বিমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিপালনব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউর নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে বিমা খাতকে অবৈধ অর্থের উৎস গোপন করা, অর্থ স্থানান্তর কিংবা সন্ত্রাসে অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাভাবিক লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন করলে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে। এসব লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথি অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে তা যাচাই করা যায়।
এ ছাড়া জটিল, অস্বাভাবিক বা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই, এমন বিমা পলিসি ও লেনদেনের বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড শনাক্ত হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিমা পলিসি গ্রহণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ছবি ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন উৎস থেকে যাচাই করতে হবে। গ্রাহকের পক্ষে অন্য কেউ পলিসি পরিচালনা করলে ওই ব্যক্তির পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ ক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠান বিমা পলিসি গ্রহণ করলে তার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও পরীক্ষা করতে হবে। নির্দেশনায় ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক কিংবা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
বিদেশি বাণিজ্যসংক্রান্ত বিমার ক্ষেত্রেও যাচাইপ্রক্রিয়া জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমদানি-রপ্তানির এলসি নম্বর, চুক্তি, পণ্যের বিবরণ ও শিপিং-সংক্রান্ত নথি ব্যাংকের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে অর্থপাচার বা আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিমা ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তালিকা যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক ও লেনদেন শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিটি বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইউনিটটি ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন পর্যবেক্ষণ, প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন পরিপালন এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য যথাসময়ে বিএফআইইউতে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করবে।
আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং বিমা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রাহক যাচাই, মালিকানার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত এবং সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে বিমা কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।