আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। এ ছাড়া ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রদেশটির গভর্নর আওয়াদ আল-ওয়াজির। সূত্র: রয়টার্স
সোমবার সেনাদের প্রশিক্ষণ চলাকালে শিবিরটিতে এ হামলা হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হুথি বিদ্রোহীরা সেখানে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে ঘটনাস্থলে আহত ব্যক্তি ও রক্তাক্ত মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
হামলার দায় স্বীকার করে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তাঁদের বাহিনী ওই প্রশিক্ষণ শিবিরকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাঁর দাবি, শিবিরটি সৌদি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের হুথি বাহিনী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে তীব্র হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বর থেকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে হুথিদের তৎপরতা বাড়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
চলতি মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। এ সময় প্রণালীর কাছাকাছি কয়েকটি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে তারা।
অন্যদিকে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ শহর অবরুদ্ধ করে রেখেছে হুথিরা। শহরটি হুথিবিরোধী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে পরিচিত।
ইয়েমেনের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত শাবওয়া প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি প্রদেশ। এডেন উপসাগরের উপকূলবর্তী এ অঞ্চলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনা বালহাফ এলএনজি কমপ্লেক্স অবস্থিত। সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন করা হয়।
এ কারণে শাবওয়ায় সংঘাতের বিস্তার শুধু সামরিক পরিস্থিতিতেই নয়, দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বৃহত্তর উত্তেজনার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিরা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এসব হামলার প্রভাব নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে উদ্বেগ রয়েছে।
ইয়েমেনে সংঘাতের সূচনা ২০১৪ সালে, যখন হুথি বাহিনী রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য করে। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর লড়াই কিছুটা কমলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইয়েমেন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে রয়েছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে সংঘাত বাড়লে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।