নিজস্ব প্রতিনিধি:
সরকারের বিরুদ্ধে গণভোটের রায় উপেক্ষা, সাংবিধানিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটার অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন না করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাষ্ট্র পরিচালনা করা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রাজধানীতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিএনপি জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করছে না বলেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। তাঁর দাবি, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য জনগণের গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি বাস্তবায়ন।
তিনি বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদসহ সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকদের বসাচ্ছে। ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে নির্দিষ্ট নিয়োগের তালিকা বা নথি উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, দলটি নিজেদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের অবস্থানে অনড় থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাঁর অভিযোগ, সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথে এগিয়ে গিয়ে বিএনপি পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো ধরে রাখতে চাইছে।
গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। জনগণের এই রায় উপেক্ষা করে বিরোধী দলের সহযোগিতা ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জনমতের প্রতি অবজ্ঞা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়ার ঘটনা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার নীতির পরিপন্থী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অবসান।
এ ছাড়া মাদরাসার ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের বসানোর সুযোগ তৈরি করতেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর অনির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপকে তিনি রাজনৈতিক বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওসমানী উদ্যানে একটি অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার অংশগ্রহণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বিরোধীদলীয় নেতার নাম যথাযথভাবে উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম আমন্ত্রণপত্রে রাখা হয়েছিল।
রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী বলে দাবি করে তিনি বলেন, আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না পাওয়ায় তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে অসত্য ও হাস্যকর আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, বিরোধী দল সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণ নিয়ে কথা বললে তাদের রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তাঁর দাবি, এভাবে বিরোধী দলের সমালোচনাকে দমন করে সরকার নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছে।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য আমীর হামজার ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে রাজশাহীতে একটি সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি। এসব কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে বিরোধী দলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার।
তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের কর্মসূচি উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি করছে এবং এর ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন কি না, তা সংবাদ সম্মেলনের সরবরাহ করা বিবরণে স্পষ্ট নয়।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের জোট করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে জামায়াত জাতীয় পার্টি ও বামপন্থী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছে। তাঁর দাবি, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক দাবিতে যৌথ আন্দোলন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট নয়।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বিএনপির সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য, সে সময় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় জামায়াতের ভূমিকা এবং জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় বই প্রকাশের কথাও তুলে ধরেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে সমস্যা রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারের, বিএনপির এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা তথ্যে নেই। গণভোটের ফল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা, পিএসসি-সংক্রান্ত অভিযোগ, আমন্ত্রণপত্রের বিষয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচির অনুমতি বাতিলের ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যুক্ত করা প্রয়োজন।