https://cns24news.com/

উচ্চশিক্ষায় অধ্যাপক-সংকট: সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই একজনও, প্রভাষকনির্ভর পাঠদান

প্রকাশের তারিখ: 21 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
উচ্চশিক্ষায় অধ্যাপক-সংকট: সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই একজনও, প্রভাষকনির্ভর পাঠদান

তানভীর রায়হান:

বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার মান নির্ভর করে দক্ষ শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও অধ্যাপকের সংখ্যা বাড়ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা-পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপকও নেই। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা হাতে গোনা। এতে উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮০টি। এর মধ্যে পাঠদান চালু থাকা ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজার ৬০৩ জন। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক ৫ হাজার ৩৫৬ জন এবং প্রভাষক ২ হাজার ২৫২ জন।

তবে সামগ্রিক পরিসংখ্যানের আড়ালে বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে শিক্ষকসংখ্যা ও জ্যেষ্ঠতার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক নেই, আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র দুজন। ফলে শিক্ষকসংখ্যা থাকলেও অভিজ্ঞ শিক্ষক, গবেষণা তত্ত্বাবধান ও একাডেমিক নেতৃত্বের পর্যাপ্ততা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অধ্যাপক নেই। এ ছাড়া ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা ১০ জনেরও কম।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাঠামো পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। সেখানে ৯৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬২ জনই প্রভাষক। অন্যদিকে, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ হাজার ৭৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র দুজন।

অধ্যাপকের স্বল্পতা শুধু পদমর্যাদার পরিসংখ্যান নয়; এটি গবেষণা তত্ত্বাবধান, উচ্চতর ডিগ্রির শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং বিভাগীয় নেতৃত্বের সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক না থাকলেই সেখানে পাঠদান হচ্ছে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকরাও পাঠদান করেন। মূল প্রশ্ন হলো, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষণার নেতৃত্বের ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হচ্ছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকসংকটের চিত্র উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১৬ হাজার ৮৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার ৮৫৫ জন প্রভাষক, মোট শিক্ষকের অর্ধেকেরও বেশি।

জেড এইচ শিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে স্থায়ী বা খণ্ডকালীন কোনো অধ্যাপক নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী অধ্যাপকের সংখ্যা ১০ জনের কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে শুধু পদ পূরণ করলেই চলে না; প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, গবেষণার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক বিভাগে পর্যাপ্ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ এবং একাডেমিক তত্ত্বাবধান সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মঞ্জুর আহমেদের মতে, ব্যয় সাশ্রয়ের প্রবণতার কারণে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগে অনীহা দেখায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং কার্যকর ক্যারিয়ার কাঠামো প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।

এ ধরনের কাঠামো থাকলে শিক্ষকরা পেশাগত উন্নয়নের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অভিজ্ঞ শিক্ষক ধরে রাখার পরিকল্পনা করতে পারবে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের মান, গবেষণায় অবদান ও পদোন্নতির শর্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।

ইউজিসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. আলমগীর হোসেনের মতে, পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠার বিকল্প নেই। তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে। তবে পিএইচডিধারী শিক্ষক বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চশিক্ষার সংকট শুধু শিক্ষকসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ৫৪টি বেসরকারি ও ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো ভাড়া করা ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাবের কারণে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং গবেষণার অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে বাস্তবতা আলাদা হওয়ায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ স্বীকার করেছেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র একজন বা দুজন প্রভাষক দিয়ে বিভাগ পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষকদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের যুক্ত করার উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, দক্ষ শিক্ষকদের ধরে রাখা, গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং পদোন্নতির স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক, গবেষণার অবকাঠামো এবং স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য কার্যকর নীতিমালা, পিএইচডিধারী শিক্ষক বৃদ্ধি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট নিরূপণ জরুরি। একই সঙ্গে স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষকসংখ্যা, অধ্যাপকের অনুপাত, শূন্য পদ, গবেষণা কার্যক্রম এবং অবকাঠামোর তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরাও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন।

উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়; জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে অধ্যাপক ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি দূর করা এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।