https://cns24news.com/

ডিজে পার্টির আয় থেকে ৭০ শতাংশ নিতেন অতিরিক্ত ডিআইজি জহির, তদন্তে উঠছে পুরোনো অভিযোগও

প্রকাশের তারিখ: 21 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
ডিজে পার্টির আয় থেকে ৭০ শতাংশ নিতেন অতিরিক্ত ডিআইজি জহির, তদন্তে উঠছে পুরোনো অভিযোগও

বিশেষ প্রতিনিধি:

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ঢাকার পুলিশ হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজন এবং সেখান থেকে আয়ের বড় অংশ নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আবাসন প্রকল্প, বদলি বাণিজ্য ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে এসব আয়োজনে অংশ নিতেন অতিথিরা। পার্টি থেকে প্রাপ্ত অর্থের ৭০ শতাংশ জহির পেতেন বলে গ্রেপ্তার বাড়িটির কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন বলে দাবি পুলিশের।

তবে জহিরের বক্তব্য, তিনি শুধু বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন; সেখানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তার দায় তাঁর নয়।

ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল এবং সীসা সেবনের কারণে ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ ছিল। অভিযানকালে প্রায় ২২টি গাড়ি বাড়ির সামনে ছিল বলে জানান তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ২৬ জন তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও ছিলেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। অভিযানে মদের তিনটি বোতল, ইয়াবা, কুশ নামের একটি মাদকদ্রব্য এবং যৌনস্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট কিছু সামগ্রী উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।

এ ঘটনায় বাড়ি থেকে আটক ৮৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডিসি ইলিয়াস কবির। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

ডিসির ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার মাধ্যমে এসব আয়োজনের নিবন্ধন করা হতো। অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। বাড়ি ভাড়া বাবদ অর্থ লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এসব আয়োজনের মোট আয়, ব্যয়ের হিসাব এবং অর্থের চূড়ান্ত বণ্টন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

জহিরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি শুধু ওই বাড়িতে আয়োজিত পার্টিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে তাঁর সঙ্গে ‘রিমঝিম পুলিশ টাউন’ নামের একটি আবাসন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির মাধ্যমে পুলিশের ২৪তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্লট কিনতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা প্লট কিনতে রাজি হননি, তাঁদের পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া জমি দখল, জমির মূল্য নিয়ে অনিয়ম এবং জমি বিক্রিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির সঙ্গে জহিরের পাশাপাশি পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা প্রলয় জোয়ারদারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। জহিরের বন্ধু অলিউর রহমানের মাধ্যমে কোম্পানি গঠনের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, ভুক্তভোগীদের বিস্তারিত বক্তব্য এবং অভিযুক্তদের জবাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

পুলিশের সাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চপ্রধান মনিরুল ইসলামের সঙ্গে জহিরের ঘনিষ্ঠতার কথাও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মনিরুলের সহযোগিতায় পিওএইচএস-২ প্রকল্পের জমি কেনার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুযোগ পায় রিমঝিম আবাসন কোম্পানি।

এ প্রক্রিয়ায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা গোলাম রাসেল, আসাদুজ্জামান এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জমি কেনার চুক্তির বিপরীতে কোটি কোটি টাকা নেওয়া হলেও সেই অর্থের বিনিময়ে এক বিঘা জমিও কেনা হয়নি এবং অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভাগ করে নিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে চুক্তিপত্র, আর্থিক লেনদেনের নথি, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত-ফল বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

পুলিশের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্রের দাবি, জুলাই আন্দোলনের পর জহির তাঁর আগের ঘনিষ্ঠতার বলয় থেকে সরে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার আশ্রয় নেন। এরপর সদর দপ্তরের বিভিন্ন শাখায় পদায়ন ও বদলির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানির বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী পছন্দের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কিনতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাপ দেওয়া হতো। বাজারদর বা আগের সরবরাহকারীর দরের তুলনায় অন্তত ১৫ শতাংশ বেশি দামে পণ্য কেনার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে ক্রয়াদেশ, দরপত্র, বিল-ভাউচার ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বাড়িতে ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগ সামনে আসার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে তাঁর দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ পদক্ষেপকে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একইভাবে, আবাসন প্রকল্প, বদলি বাণিজ্য, কেনাকাটায় অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগগুলোও পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জহির, সংশ্লিষ্ট সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে।