https://cns24news.com/

শাহজালালে ১৫–২০ মিনিটেই লাগেজ, তবে যাত্রীসেবায় রয়ে গেছে নানা ঘাটতি

প্রকাশের তারিখ: 22 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
শাহজালালে ১৫–২০ মিনিটেই লাগেজ, তবে যাত্রীসেবায় রয়ে গেছে নানা ঘাটতি

রায়হান আহমেদ:

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ পাওয়ার অপেক্ষা কমে ১৫ থেকে ২০ মিনিটে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে চালু হয়েছে লাইভ মনিটরিং ব্যবস্থাও। তবে লাগেজ দ্রুত হাতে পেলেই বিমানবন্দরের সামগ্রিক সেবার মান নিশ্চিত হচ্ছে না। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের চলাচল এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিয়ে এখনো অসন্তোষ রয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘ আকাশপথের যাত্রা শেষে দেশে ফিরে লাগেজের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা প্রবাসী, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে লাগেজ সরবরাহের সময় কমে আসাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে বিমানবন্দরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে লাগেজ সংগ্রহ ও বাইরে বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও যাত্রীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং বেল্টে পৌঁছানোর বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখা সম্ভব হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের মতে, এ ব্যবস্থা লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের আস্থা তৈরিতে সহায়তা করবে। লাগেজের নিরাপত্তা জোরদার এবং অভিযোগের ঝুঁকি কমাতেও প্রযুক্তিনির্ভর এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার উন্নতি হয়েছে এবং যাত্রীরা এখন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ পাচ্ছেন। প্রায় দুই মাস আগে পরিকল্পনা নেওয়া লাইভ ব্যাগেজ মনিটরিং ব্যবস্থা ইতোমধ্যে চালু হয়েছে বলেও জানান তিনি। সেবার এ মান ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

লাগেজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির কথা বলা হলেও বিমানবন্দরের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। সরেজমিন পর্যবেক্ষণের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান প্রবেশপথে যথাযথ তল্লাশি ছাড়া যানবাহন ও মানুষের প্রবেশ, বহির্গমন এলাকার নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে দর্শনার্থীদের ঢুকে পড়া এবং সড়কে যানবাহনের জটের মতো সমস্যা দেখা যায়।

বিমানবন্দরের পার্কিং সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বহির্গমন সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য গাড়ির অবস্থান, অর্থের বিনিময়ে বাইরের গাড়ি পার্কিংয়ের অভিযোগ, ভিক্ষুকের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন পণ্য বিক্রির বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। টার্মিনাল-১ ও ২-এর প্রবেশ ও বহির্গমন এলাকায় যাত্রী ও তাঁদের স্বজনদের ভিড়ও ভোগান্তি বাড়াচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে, বিমানবন্দরে যাত্রীবেশে তিনজনের লাগেজ চুরির ঘটনায় জসিম নামের এক ব্যক্তিকে চাঁদপুরের কচুয়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এ সময় চুরি হওয়া তিনটি লাগেজ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এপিবিএনের পুলিশ সুপার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান।

ঘটনাটি লাগেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, লাগেজ সংগ্রহের পর বের হওয়ার সময় পুনরায় তল্লাশি ও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব প্রক্রিয়া যেন হয়রানি বা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির কারণ না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ইতালি প্রবাসী উজ্জল হোসেন বলেন, দেশের প্রধান বিমানবন্দর প্রতিদিন প্রবাসী বাংলাদেশি, বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের যাতায়াতের কেন্দ্র। বিমানবন্দরের সেবার সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি, পর্যটনশিল্প ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়ও জড়িত।

তাঁর মতে, অল্প সময়ে লাগেজ পাওয়া ভালো উদ্যোগ। তবে লাগেজ নিয়ে বের হওয়ার সময় আবার থামিয়ে ব্যাগের ভেতরে কী আছে, কতটুকু আছে, এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া বিব্রতকর।

সিঙ্গাপুর প্রবাসী আমিনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে বিমানবন্দরে ভালো সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সেই প্রত্যাশাকে ম্লান করে দেয়। বছরের পর বছর কাজ করে পরিবারের জন্য কেনা জিনিসপত্র বিমানবন্দরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রবাসীদের উদ্বেগের কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, লাগেজ দ্রুত পাওয়া যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও অন্যান্য সেবার মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।

তাঁর মতে, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মান শুধু আধুনিক ভবন বা উন্নত টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে না। পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বসার জায়গা, মানসম্মত শৌচাগার, কার্যকর তথ্যকেন্দ্র, নিরাপত্তা, অভিবাসন প্রক্রিয়ার দক্ষতা, লাগেজ সরবরাহ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং কর্মীদের পেশাদার আচরণ—সবকিছুর সমন্বয়েই যাত্রীসেবার মান নির্ধারিত হয়।

তিনি বলেন, আগমন এলাকায় যাত্রীদের চলাচল, শুল্কসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বাইরে যাওয়ার পথ এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন, যাতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় তৈরি না হয়। একইভাবে বহির্গমন এলাকায় প্রবেশ, চেক-ইন, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও বোর্ডিংয়ের প্রক্রিয়াও সুশৃঙ্খল হওয়া দরকার।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ ভ্রমণের পর ক্লান্ত যাত্রীদের জন্য দ্রুত লাগেজ সরবরাহের পাশাপাশি বসার জায়গা, স্পষ্ট নির্দেশনা, প্রয়োজনীয় সহায়তাকর্মী এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব চলাচলের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব সরাসরি যাত্রীদের ওপর পড়ে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বেবিচকের তদারকি বাড়ানো, স্ক্যানারগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট করার ওপর জোর দেন।

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে কাগজে-কলমে প্রটোকল থাকাই যথেষ্ট নয়। বাস্তবে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীদের অনিয়ম বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আরও আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। লাগেজ সরবরাহের সময় কমিয়ে আনার সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করা গেলে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।