চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে তিন চাকার যানবাহন। এসব যানবাহনের সঙ্গে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য দ্রুতগতির গাড়ির সংঘর্ষে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বিধিনিষেধ কার্যকরে নানা বাধার মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও টমটমের চলাচল দেখা যাচ্ছে। এসব ছোট যানবাহন দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব যানবাহনের অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপের কারণে বিধিনিষেধ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহাসড়কে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিন চাকার যানবাহনের সঙ্গে বড় যানবাহনের সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং তিনজন গুরুতর আহত হন।
গত ৭ অক্টোবর একই মহাসড়কের সাতকানিয়ায় নয়াখাল পাঠানী পুলের দক্ষিণ পাশে বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত আরেক যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ৯ অক্টোবর পটিয়ায় মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে অটোরিকশার তিন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি লোহাগাড়ার আধুনগর এলাকায় অটোরিকশা ও মিনি ট্রাকের সংঘর্ষে একজন নিহত এবং শিশুসহ সাতজন আহত হন।
এ ছাড়া ২৮ মার্চ রাতে সীতাকুণ্ডের মডার্ন হাসপাতাল এলাকায় অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ছয়জন আহত হন। ৩১ মে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড বাজার এলাকায় বাস, ড্রামট্রাক, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে একজন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন।
চট্টগ্রামে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে বলে দাবি করেছে পরিবহনসংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন।
চট্টগ্রাম অটোরিকশা ও অটো টেম্পো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী জানান, চট্টগ্রামে প্রায় ৬৩ হাজার নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে নগরীতে ১৩ হাজার এবং জেলার অন্যান্য এলাকায় ৫০ হাজার।
তিনি দাবি করেন, এর বাইরে নগর ও জেলায় আরও প্রায় ৫০ হাজার অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। পাশাপাশি কয়েক লাখ টমটম, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশাও সড়কে রয়েছে।
টিটু চৌধুরীর অভিযোগ, মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হচ্ছে না। ফলে অননুমোদিত যানবাহন মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
তবে যানবাহনের এই সংখ্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন ও দ্রুতগতির গাড়ি একই লেনে চলাচল করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অনেক স্থানে পৃথক সার্ভিস লেন না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মীরসরাই পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরুল আলম বলেন, পৌরসভা বাজারের ইউটার্নে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। নিষিদ্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচলের পাশাপাশি কিছু যানবাহন উল্টো পথে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই অংশে ইউটার্ন নেওয়ার সময়ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বাস ও ট্রাকচালকেরা। তাঁদের মতে, পৃথক ইউটার্ন লেন না থাকায় দ্রুতগতির যানবাহনকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এর সঙ্গে ছোট যানবাহনের চলাচল যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহনের পাশাপাশি অযান্ত্রিক যানও বাসের জন্য নির্ধারিত লেনে চলাচল করছে। পৃথক সার্ভিস লেনের অভাব এবং আইন প্রয়োগে ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহানও মহাসড়কে অননুমোদিত তিন চাকার যানবাহনের চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রয়োগ না হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার দায় বাসচালকদের ওপর বর্তায়।
মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে বিধিনিষেধ থাকলেও তা কার্যকর করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০১২ সালের অক্টোবরে উচ্চ আদালত মহাসড়কে সিএনজিচালিত তিন চাকার অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহাসড়কে এসব যানবাহনের চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি নুরুল আবছার বলেন, তিন চাকার যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে মহাসড়কে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে পুরোপুরি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ কর্মকর্তার এই বক্তব্য মহাসড়কে বিদ্যমান বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দুর্ঘটনা কমাতে বিদ্যমান আইন কার্যকর করার পাশাপাশি নিরাপদ বিকল্প সড়কব্যবস্থা, পৃথক সার্ভিস লেন এবং চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে চট্টগ্রামের মহাসড়কে ছোট ও বড় যানবাহনের সংঘাত থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।