https://cns24news.com/

সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না, দায় এড়াচ্ছে কোন প্রতিষ্ঠান?

প্রকাশের তারিখ: 22 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না, দায় এড়াচ্ছে কোন প্রতিষ্ঠান?

তানভীর রায়হান:

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা হলেই সামনে আসে চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্যের বিষয়টি। কিন্তু দুর্ঘটনার পেছনে কি শুধু চালকের ভুলই দায়ী? যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, চালকের দক্ষতা পরীক্ষা, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং পরিবহন পরিচালনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছে—সে প্রশ্নও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তার সংকটকে কেবল চালকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যার অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ৬১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ২১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন। অর্থাৎ, সড়কে প্রাণহানি কমানোর উদ্যোগ থাকলেও দুর্ঘটনার ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর নজরদারি, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, চালকদের বাস্তব দক্ষতা যাচাই এবং পরিবহন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আইন কঠোর করে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা কঠিন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৫৮৯টি দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৫১৭টি দুর্ঘটনায় ৪৩২ জন, মার্চে ৫৭৬টি দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন এবং এপ্রিলে ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত হন।

মে মাসে ৬১৪টি দুর্ঘটনায় ৫৯৮ জন নিহত হন, যা প্রথম নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক প্রাণহানি। জুনে ৪৭২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন, জুলাইয়ে ৪৫৮টি দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন, আগস্টে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন প্রাণ হারান।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার চিত্রও উদ্বেগজনক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৬ হাজার ৪০২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬ হাজার ২৭ জন নিহত হয়েছেন।

শুধু গত সেপ্টেম্বরেই ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হন। ওই মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ ছিলেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট।

একই মাসে ১০৬ জন পথচারী নিহত হন, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হন ৫৩ জন।

সড়কের বাইরেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে দুর্ঘটনা ও যানজট, কোনোটিই কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ছোট যানবাহনের একটি বড় অংশ ট্রাফিক আইন মানতে চায় না। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ইজিবাইকও সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে। এসব যানবাহনের অনেক চালকের সড়ক সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। উল্টো পথে চলাচলসহ নানা অনিয়ম দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শামসুল হকের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু চালক বা ট্রাফিক পুলিশের নয়; সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও সারা বছর কার্যকর নজরদারি চালাতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেই বিনিয়োগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।

দুর্ঘটনার পর চালকের ভুলকে সামনে আনা হলেও তাঁদের কর্মপরিবেশ ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি রয়েছে। এ ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তির মাধ্যমে গতির ওপর নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

তবে তাঁর মতে, দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। অনেক চালককে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে হয়। তাঁদের নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা থাকে না। কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, পিঠে ব্যথা এবং রক্তচাপের ওঠানামার মতো বিষয়ও নিরাপদে গাড়ি চালানোর সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রথমে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, এরপর যানবাহনের অবস্থা এবং তারপর চালকের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। এই তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) মহাসচিব লিটন এরশাদ মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক সড়ক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, নগর সড়ক থেকে শুরু করে মহাসড়ক পর্যন্ত এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত গতি এবং ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।

তাঁর মতে, বাস, ট্রাক ও মিনিবাসের দুর্ঘটনার পেছনেও অতিরিক্ত গতি এবং পাল্টাপাল্টি চলাচলের মতো কারণ রয়েছে। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়; ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এনে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

লিটন এরশাদ বলেন, ঢাকার গণপরিবহনকে পরিকল্পিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। গণপরিবহন র‍্যাশনালাইজেশনের মাধ্যমে যানবাহনের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যাত্রী তোলার জন্য পাল্লাপাল্লি এবং হুড়াহুড়ি কমানো সম্ভব।

সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় চালক ও যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন লিটন এরশাদ।

তিনি বলেন, অনেক পথচারী রাস্তা পার হওয়ার সময় বা ফুটপাত দিয়ে চলার সময়ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। অনেকে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করে যত্রতত্র রাস্তা পার হন। আবার কেউ কেউ চলন্ত গাড়ির সামনে হাত দেখিয়ে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

তাঁর মতে, পথচারীদের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণের অভ্যাস তৈরি করতে হবে। তবে গাড়ির তাৎক্ষণিকভাবে থামার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে নিরাপদ স্থান ও নির্ধারিত পারাপারব্যবস্থা ব্যবহার করাও জরুরি।

লিটন এরশাদ বলেন, চালকদের প্রশিক্ষণ, আইনের প্রয়োগ এবং মালিকদের সচেতনতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু চালকদের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটছে না, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালক, পথচারী, যাত্রী, মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চালকের দক্ষতা যাচাই এবং যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক শামসুল হক।

তিনি বলেন, চালককে লাইসেন্স দেওয়ার আগে বাস্তব সড়কের পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ভেতরে গাড়ি চালানো, জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে পরীক্ষা কিংবা সড়কের চিহ্ন শনাক্ত করার মাধ্যমে একজন চালকের পূর্ণ দক্ষতা যাচাই করা যায় না।

তাঁর মতে, বাস্তব সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা জরুরি।

শামসুল হক বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যানবাহনের ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট দেওয়ার ব্যবস্থায়ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। একই করিডরে একাধিক পরিবহনের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হলে তার প্রভাব সড়ক নিরাপত্তায় পড়ে।

তিনি মনে করেন, বিআরটিএকে পেশাদারভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং পুলিশকে সারা বছর আইন প্রয়োগে সক্রিয় থাকতে হবে। বিশেষ অভিযানকেন্দ্রিক তৎপরতার পরিবর্তে নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ বা আইন কঠোর করলেই দুর্ঘটনা কমবে না। প্রয়োজন সড়ক, যানবাহন, চালক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়।

অধ্যাপক শামসুল হকের মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল নিয়োগ এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক নিরাপত্তায় সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিতে হবে।

অন্যদিকে, লিটন এরশাদ সড়কের প্রকৌশলগত উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিদ্যমান সড়কগুলোকে আরও নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

সাইদুর রহমানের মতে, প্রযুক্তির মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং চালকদের সুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে পরিবহন পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর চ্যালেঞ্জটি শুধু আইন ভাঙার প্রবণতা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা, পরিবহন খাতের ব্যবস্থাপনা, চালকদের কর্মপরিবেশ এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের আলোচনা হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম কতটা কার্যকর, তার মূল্যায়নও জরুরি। সড়কে প্রাণহানি কমাতে হলে দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগ সত্ত্বেও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অধরাই থেকে যেতে পারে।