https://cns24news.com/

হেফাজতের উদ্যোগে সাত কওমি দলের জোট, স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়ার আলোচনা

প্রকাশের তারিখ: 23 Oct 2026   |   প্রতিবেদক: editor
হেফাজতের উদ্যোগে সাত কওমি দলের জোট, স্থানীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়ার আলোচনা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে একমত হয়েছে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দল। ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে জোট গঠন ও কর্মসূচি পালনের বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।

জোটে থাকার বিষয়ে আলোচনা করা সাতটি দল হলো, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।

তবে জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্য রাজনৈতিক জোট থেকে দলগুলোর বেরিয়ে আসার বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। এ নিয়ে আগামী ৫ ডিসেম্বর লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জোটের কাঠামো ও কর্মসূচি নির্ধারণ করতে পারবে।

সাত দলের এই উদ্যোগে রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে রয়েছে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির জোটের সঙ্গে যুক্ত। হেফাজতের পক্ষ থেকে আগে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, সাত দলের ঐক্য কার্যকর করতে হলে জামায়াতের সঙ্গে থাকা দলগুলোকে ওই জোট ছাড়তে হবে। সেই শর্ত পূরণ হলে জমিয়তও বিএনপির জোট ছাড়বে বলে জানানো হয়েছিল।

বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আপাতত এসব শর্ত পূরণ হচ্ছে না। জমিয়তের অবস্থান হলো, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি ১১-দলীয় ঐক্য ছাড়লে তারাও বিএনপির জোট ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। তবে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, সাত দলের ঐক্য চূড়ান্ত হলে কোনো দল একই সময়ে দুটি জোটে থাকতে পারবে না।

বৈঠক শেষে গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাতটি দলই দেওবন্দের আদর্শের অনুসারী এবং সমমনা। তাই প্রথম লক্ষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের মধ্যে জোট গঠন। জোটের নেতৃত্বে কোনো একক দল বা নেতা থাকবেন না; সাত দলের শীর্ষ নেতারাই সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব দেবেন।

জোট গঠনে হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, সংগঠনটি এখানে ‘ঘটকের’ ভূমিকা পালন করছে। হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই থাকবে। ইসলামপন্থি দলগুলোকে এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের। গত নির্বাচনের আগে ইসলামী আন্দোলনও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল। আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় দলটি গত জানুয়ারিতে জোট ছাড়ে। ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের দাবি, জামায়াত ইসলামের আদর্শ থেকে সরে যাওয়ায় তারা জোট ত্যাগ করেছেন। তবে আসন বণ্টন নিয়ে মতবিরোধও আলোচনায় এসেছিল।

হেফাজত গত নির্বাচনের আগে থেকেই দেওবন্দি ধারার দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা করছে। সংগঠনটি জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদির মতবাদের বিরোধী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির ও মহাসচিব জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর হেফাজত শর্ত দেয়, সংগঠনটির সঙ্গে থাকতে হলে জামায়াতের জোট ছাড়তে হবে। এর মধ্যে খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলন জামায়াতের জোট ছেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে খেলাফতের একটি অংশ এখনো ওই জোটে রয়েছে।

গত জুলাই ও সেপ্টেম্বরে হেফাজতের কার্যালয়ে সাত দলের নেতাদের দুই দফা বৈঠক হয়। ওই বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি কওমি ধারার দলগুলোর ঐক্যের পক্ষে মত দিলেও জামায়াতের জোট ছাড়ার শর্ত আরোপের বিরোধিতা করে। তবে জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন করে জোট গঠনের আলোচনা গতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, একাধিক জোটে থাকা নিয়ে সমস্যা নেই। জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনে ১১-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর আলাদা জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহারও জানিয়েছেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলনে তাঁরা ১১-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে থাকবেন। শুক্রবারের বৈঠক এবং ৩১ অক্টোবরের লংমার্চেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সাত দলের তিনজন করে নেতা এবং হেফাজতের তিন নেতা অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা বলেন, জামায়াত এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিলে কওমি ধারার দলগুলোর এক হওয়া জরুরি। জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দি মতাদর্শের দলগুলোরও নতুন জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সাত দলের জোটে এনসিপিসহ অন্য দলগুলোকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। আগামী ২৭ জানুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই নেতা জানান, জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে তাঁরা সাত দলের জোটে থাকার বিষয়ে এগোবেন।

এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকার কারণে কওমি ধারার বিভিন্ন দলের নেতা ও আলেমদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, দেওবন্দি মতাদর্শের দলগুলোর নেতাকর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটূক্তি করবেন না।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, দলগুলো বিচ্ছিন্ন থাকায় ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। ঐক্য গড়ে উঠলে পারস্পরিক সমালোচনা ও আক্রমণ কমবে বলে তাঁরা আশা করছেন। তবে জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান বজায় থাকবে। সনদের পক্ষে থাকা দলগুলো এর বাস্তবায়নের দাবিতে নিজস্ব কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।