সম্পাদকীয়
উন্নয়ন মানেই নতুন সড়ক, শিল্পকারখানা, আবাসন কিংবা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ, বাংলাদেশে উন্নয়নের হিসাব অনেকটা এভাবেই করা হয়। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা গুরুত্ব পায়। কিন্তু পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী দখল কিংবা জলাশয় ভরাটের ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য খুব কমই বিবেচনায় নেওয়া হয়। অথচ প্রকৃতি ধ্বংসের এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় পুরো সমাজকে।
কক্সবাজারের সৈকত, সেন্টমার্টিনের প্রবালপ্রাচীর, কুয়াকাটার উপকূলীয় বন, বান্দরবানের পাহাড় এবং সিলেটের সাদাপাথর, বিভিন্ন এলাকার পরিবেশগত সংকট একই প্রশ্ন সামনে আনে: প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে তাৎক্ষণিক মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে আমরা ভবিষ্যতের আয় ও জীবিকার ভিত্তি দুর্বল করছি কি না।
পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণ করলে বিনিয়োগকারীর আয় হতে পারে। নদীর পাথর বিক্রি করেও তাৎক্ষণিক অর্থ পাওয়া যায়। জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুললে জমির দাম বাড়ে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি, পর্যটন আকর্ষণ হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, জলাবদ্ধতা ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা সংকুচিত হওয়ার ব্যয় কে বহন করবে? এসব ক্ষতির অনেকটাই প্রকল্পের হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
ঢাকা ও আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় ১৭৭৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে বলে একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। জলাশয় হারানোর ফলে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক সক্ষমতা কমে যায়। পরে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ব্যয় বাড়ে, যার চাপ পড়ে নগরবাসী ও সরকারি অর্থের ওপর।
অর্থনীতিতে এ ধরনের ক্ষতিকে ‘নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব’ বলা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাভ পেলেও তার কর্মকাণ্ডের ক্ষতি বহন করে অন্যরা। প্রকৃতির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বন কার্বন শোষণ করে, জলাশয় পানি ধারণ করে, আর উপকূলীয় বন ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। এসব সেবার বাজারদর না থাকলেও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের Bangladesh Country Environmental Analysis প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের তথ্যের ভিত্তিতে পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক ব্যয় বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাব সরাসরি বন উজাড় বা পাহাড় কাটার ক্ষতি নির্দেশ করে না; তবে পরিবেশগত অবক্ষয়ের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বোঝার ব্যাপকতা তুলে ধরে।
উন্নয়নের সাফল্য তাই শুধু জিডিপি বৃদ্ধি কিংবা নতুন স্থাপনা নির্মাণ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বন, পাহাড় ও জলাশয়ের ক্ষতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশগত আইন কার্যকর করাও জরুরি।
প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই পর্যটনের জন্য প্রকৃতিকেই ধ্বংস করা হলে তা টেকসই হতে পারে না। পাহাড়ের সৌন্দর্য বিক্রি করতে গিয়ে পাহাড় কেটে ফেলা কিংবা সমুদ্রসৈকতের ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে সৈকত দখল করা উন্নয়ন নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্পদকে বর্তমানের মুনাফার বিনিময়ে বিসর্জন দেওয়া।
প্রকৃতির ক্ষতি বাদ দিয়ে উন্নয়নের লাভের হিসাব কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের শর্ত হলো, প্রকৃতিকে ব্যয় হিসেবে নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা।