নিজস্ব প্রতিনিধি:
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা, তদন্ত করা এবং বিচারের জন্য আদালতে হাজির করা। আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই।
তিনি বলেন, “একটা খুন তো যেকোনো মানুষই করতে পারে। একটা রাষ্ট্র রাষ্ট্র হয়ে ওঠে যখন সে বিচার করার ক্ষমতা প্রয়োগ করে। রাষ্ট্র যখন কাউকে ধরে খুন করে ফেলে, তখন রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না, সেটা মাস্তানের মতো আচরণ করে।”
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তথ্য উপদেষ্টা সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দেশে উগ্রবাদী প্রবণতা ও কিছু গোষ্ঠীর আস্ফালন থাকলেও সরকার নিশ্চুপ নেই। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এ নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদরদফতর ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
তিনি বলেন, আইজিপির মূল বক্তব্য থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া অসম্ভব নয়। অনেকে বক্তব্যটিকে সেভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তবে পরবর্তী ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বোঝাতে চাননি।
সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের বিষয়েও পুলিশ সদরদফতর ব্যাখ্যা দিয়েছে বলে জানান তিনি। ওই বক্তব্যে সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও অভিযোগের বিষয় ছিল উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল পদে থাকা কোনো ব্যক্তির বক্তব্য ভুলভাবে মানুষের কাছে পৌঁছালে তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আইজিপি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে শুধু ব্যাখ্যা দেওয়াই যথেষ্ট কি না কিংবা আইজিপির বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর শেষে বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে হত্যা করতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধের নিষ্পত্তি করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। আইন ও আদালতকে পাশ কাটিয়ে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারের অনুমতি থাকলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পারে—এমন বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার চাইলেও বেআইনি কাজ করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো বেআইনি নির্দেশ পালন করতে বাধ্য নন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেআইনি কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা পালন করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁদের অবশ্যই আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
একটি নির্বাচিত সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথে যাবে না বলে আশ্বস্ত করেন তথ্য উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড জনগণের মধ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা সরকারের জন্যও ক্ষতিকর।
ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক সংবাদ সম্মেলন, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ, সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, সংবিধান সংশোধন, তথ্য অধিকার আইন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেন তিনি।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর অবস্থান অনুযায়ী, অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, কাউকে আইনের বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।