আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উচ্চ বেতনের বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জোরজবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদেশি নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এসব নিয়োগের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য।
জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিদেশি নাগরিকদের বেসামরিক চাকরির আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। তাঁদের নিরাপত্তাকর্মী, চালক, নির্মাণশ্রমিক, বৈদ্যুতিক কারিগর ও অন্যান্য পেশায় কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়।
চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি এর শর্ত বুঝতে পারেননি। তাঁদের কারও কারও পাসপোর্ট ও মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে অনেকে নিহত, আহত কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিশন মোট ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও উজবেকিস্তান।
বাংলাদেশিদের কতজনকে এভাবে নিয়োগ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজন নিহত, আহত বা নিখোঁজ—প্রতিবেদনে তার নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ আগেও সামনে এসেছে। জাতিসংঘের এই অনুসন্ধান বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কমিশনের তদন্তে নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রুশ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। কমিশন প্রতারণা ও জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনাকে মানবপাচার ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করেছে।
একই প্রতিবেদনে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব হামলায় লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, বিশেষ করে শীতকালে।
কমিশনের চেয়ারম্যান এরিক মোসে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। কমিশনের মূল্যায়নে, বেসামরিক মানুষের ওপর গুরুতর দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে ২০২৫-২৬ সালের শীতে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের ভুক্তভোগী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সংগঠনের বক্তব্য ও তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার মিশন তদন্ত কমিশনের এখতিয়ার স্বীকার করে না বলে জানিয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিবেদনের তথ্য বিকৃত ও অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।