সম্পাদকীয়:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে বাংলাদেশের জন্য কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এই সফরের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানের ক্রমবর্ধমান জনবল চাহিদা এবং বাংলাদেশের কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুই দেশই লাভবান হতে পারে। তবে সে জন্য প্রচলিত শ্রম রপ্তানির ধারণা থেকে বেরিয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মীর অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাপান বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতি। দেশটিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন খাতে কর্মীর প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের পরিচর্যা, নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আতিথেয়তা ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শুধু বিপুলসংখ্যক তরুণ থাকলেই এই সুযোগ কাজে লাগানো যাবে না। প্রয়োজন জাপানের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত, ভাষায় দক্ষ এবং পেশাগতভাবে প্রস্তুত কর্মী।
এখানেই বাংলাদেশের নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। বিদেশে কতজন কর্মী পাঠানো হলো, সেটিকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি না করে তাঁদের আয়, কর্মপরিবেশ, দক্ষতা অর্জন এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। জাপানের সঙ্গে আলোচনায় আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের শ্রমবাজারের চাহিদা নিরূপণ, খাতভিত্তিক নিয়োগ পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণের মান নির্ধারণে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে জাপানি ভাষাশিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভাষাগত দুর্বলতা কর্মক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং পেশাগত অগ্রগতির বাধা তৈরি করতে পারে। তাই সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি নিয়োগকর্তাদের অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে যৌথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, জাপানি প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ অর্জনের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
তবে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিয়োগব্যয়, বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন, বিমা এবং চুক্তির শর্ত আগেই স্পষ্ট করতে হবে। মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব ও প্রতারণা কমাতে স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মীরা হয়রানি, বেতনসংক্রান্ত বিরোধ কিংবা চুক্তি লঙ্ঘনের শিকার হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
এই সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার স্থানান্তর। জাপানে কাজ করা বাংলাদেশি কর্মীরা দেশে ফিরে উদ্যোক্তা, প্রশিক্ষক কিংবা দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে প্রত্যাগত কর্মীদের জন্য ঋণ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে শ্রম অভিবাসনের সুফল শুধু প্রবাসী আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের উৎপাদনশীলতা ও শিল্পায়নেও ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাই একটি কার্যকর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির প্রেরণা হওয়া উচিত। কূটনৈতিক সমঝোতাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হবে প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ, কর্মীর নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে। জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পথ সংখ্যার প্রতিযোগিতায় নয়, বরং দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতায়।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক অর্থনীতির উপযোগী করে তোলাই হোক এই সফরের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।