https://cns24news.com/

কাপ্তাইয়ের বনে ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতি, জীবনচক্রের সঙ্গী ১০৩ উদ্ভিদ

প্রকাশের তারিখ: 01 Nov 2026   |   প্রতিবেদক: editor
কাপ্তাইয়ের বনে ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতি, জীবনচক্রের সঙ্গী ১০৩ উদ্ভিদ

জাবি প্রতিনিধি:

বনের নির্জন পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল রঙিন ডানার একটি প্রজাপতি। কখনো ফুলের ওপর বসছে, কখনো পাতার আড়ালে লুকাচ্ছে, আবার কখনো রোদের আলোয় ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। ক্ষণিকের এই সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করলেও প্রজাপতির জীবনের গল্প কেবল রঙিন ডানায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি প্রজাপতির জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বংশবিস্তারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ। যে গাছের পাতায় তার শূককীটের খাদ্য মেলে, যে উদ্ভিদে সে ডিম পাড়ে, সেই উদ্ভিদ হারিয়ে গেলে হুমকির মুখে পড়তে পারে প্রজাপতির অস্তিত্বও।

রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড় এলাকায় পরিচালিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে প্রকৃতির এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। গবেষণায় নয়টি গোত্রের ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। পাশাপাশি এসব প্রজাপতির লার্ভার খাদ্য ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পোষক উদ্ভিদ হিসেবে ৪১টি গোত্রের ১০৩ প্রজাতির উদ্ভিদ নথিভুক্ত করেছেন তাঁরা। গবেষণার ফল বলছে, প্রজাপতি সংরক্ষণ করতে হলে শুধু বনভূমি রক্ষা করলেই চলবে না, সংরক্ষণ করতে হবে তাদের জীবনচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্ভিদবৈচিত্র্যও।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন ও গবেষক সেলিনা সুলতানা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। ‘Checklist of Butterfly Larval Host Plants and Their Spatial Distribution at Ram Pahar and Sita Pahar of Kaptai National Park, Bangladesh’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর Asian-Australasian Journal of Bioscience and Biotechnology সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের আটটি নির্ধারিত স্থানে প্রজাপতির লার্ভার পোষক উদ্ভিদ এবং সেগুলোর স্থানভিত্তিক বিস্তৃতি পর্যালোচনা করেন গবেষকরা।

প্রজাপতিকে সাধারণত তার রঙিন ডানা, ফুলের ওপর উড়ে বেড়ানো কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ কাটে পাতার আড়ালে। ডিম থেকে বের হওয়ার পর শূককীট বা লার্ভা পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে রূপ নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট উদ্ভিদের পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠে। অনেক প্রজাতির প্রজাপতি আবার ডিম পাড়ার জন্যও বিশেষ কিছু উদ্ভিদ বেছে নেয়। এসব উদ্ভিদই তাদের পোষক উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত।

ফলে কোনো বনাঞ্চলে প্রচুর গাছপালা থাকলেই সেখানে সব প্রজাতির প্রজাপতির বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয় না। প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট প্রজাতির উদ্ভিদের উপস্থিতি। কাপ্তাইয়ের গবেষণায় শনাক্ত ১০৩ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৩ প্রজাতি ফ্যাবাসি গোত্রের। তালিকায় রয়েছে আম, জাম, কাজুবাদাম, আতা, আকন্দ, তেঁতুল, বট, সজনে, কাগজি লেবু ও হলুদের মতো পরিচিত উদ্ভিদও।

মানুষের খাদ্য, কৃষি কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত এসব উদ্ভিদের সঙ্গে বনের প্রজাপতির জীবনচক্রেরও সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের কাছে যে গাছ ফল দেয়, ছায়া দেয় কিংবা মসলা ও ওষুধের উপাদান জোগায়, সেই গাছের কোনো কোনো প্রজাতি প্রজাপতির লার্ভার খাদ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ একটি উদ্ভিদ একই সঙ্গে মানুষের জীবন ও বনের ক্ষুদ্র প্রাণীদের অস্তিত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় শনাক্ত ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮টি লাইসেনিডি গোত্রের। এ ছাড়া নিমফালিডি গোত্রের ১৫, প্যাপিলিওনিডি গোত্রের ১১, হেসপেরিডি ও পিয়েরিডি গোত্রের ১০টি করে, ডানাইডি গোত্রের সাতটি এবং স্যাটাইরিডি গোত্রের চারটি প্রজাতি পাওয়া গেছে। আমাথুসিডি ও অ্যাক্রেইডি গোত্রের একটি করে প্রজাতিও শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এ তালিকা কাপ্তাইয়ের বনাঞ্চলে প্রজাপতির উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। তবে গবেষণার গুরুত্ব কেবল প্রজাতির সংখ্যা নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। কোন উদ্ভিদের সঙ্গে কোন প্রজাপতির জীবনচক্র যুক্ত, কোথায় এসব উদ্ভিদ পাওয়া যায় এবং সেগুলোর বিস্তৃতি কেমন—এসব তথ্য ভবিষ্যতে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের আটটি নির্ধারিত স্থানে পোষক উদ্ভিদের প্রজাতির সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পেয়েছেন গবেষকরা। জামাই ছড়ায় সর্বাধিক ৯৭ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। শিলছড়িতে পাওয়া গেছে ৯০, ঠাণ্ডাছড়িতে ৮৯ এবং বাংছড়িতে ৮৮ প্রজাতি। অন্যদিকে সীতা মন্দির এলাকায় ৮৩, ওয়াগ্গা ছড়ায় ৭৮, বাজার ছড়ায় ৭৫ এবং রনির ছড়ায় ৬৭ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদ নথিভুক্ত করা হয়েছে।

একই জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ভিদের এমন ভিন্নতা সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো একটি এলাকায় যে পোষক উদ্ভিদ পাওয়া যায়, অন্য এলাকায় সেটি কম থাকতে পারে কিংবা একেবারেই অনুপস্থিত হতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল প্রজাপতির জন্য সব স্থান সমান উপযোগী নাও হতে পারে।

তবে পোষক উদ্ভিদের প্রজাতি বেশি হলেই কোনো এলাকাকে প্রজাপতির জন্য সবচেয়ে ভালো আবাসস্থল বলা যায় না। উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও প্রজাপতির বৈচিত্র্য এক বিষয় নয়। পোষক উদ্ভিদের প্রাপ্যতার পাশাপাশি আবহাওয়া, ঋতু, ফুলের উপস্থিতি, আলো, আর্দ্রতা এবং অন্যান্য পরিবেশগত উপাদানও প্রজাপতির বিস্তৃতিকে প্রভাবিত করে। তাই কোনো এলাকার প্রকৃত পরিবেশগত গুরুত্ব বুঝতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর পারস্পরিক সম্পর্ক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রকৃতিতে প্রজাপতির ভূমিকা শুধু সৌন্দর্য ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফুল থেকে মধু সংগ্রহের সময় কিছু প্রজাতি পরাগায়নে অবদান রাখে। অন্যদিকে প্রজাপতির ডিম, লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক পতঙ্গ বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবে তারা খাদ্যজাল ও বনজ বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

প্রজাপতির জীবনচক্রের কোনো একটি পর্যায়ে বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো প্রজাতির টিকে থাকার ওপর পড়তে পারে। কোনো এলাকায় পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি দেখা গেলেও সেখানে ডিম পাড়া ও লার্ভার বেড়ে ওঠার উপযোগী উদ্ভিদ পর্যাপ্ত না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতিটির বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পোষক উদ্ভিদের উপস্থিতি তাই প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন করার অন্যতম প্রয়োজনীয় শর্ত।

এ কারণে বন সংরক্ষণে শুধু বৃক্ষরোপণের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে, স্থানীয় উদ্ভিদসমাজ কতটা অক্ষুণ্ন থাকছে এবং সেগুলো স্থানীয় প্রাণীর জীবনচক্রে কী ভূমিকা রাখছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদ, গুল্ম ও লতাপাতার উপস্থিতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বনভূমির সব উদ্ভিদই সব প্রজাতির প্রজাপতির জন্য সমান উপযোগী নয়।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রজাপতির বৈচিত্র্য নিয়ে এর আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত একটি জরিপে ১০টি গোত্রের ১৪৬ প্রজাতির প্রজাপতি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে নতুন গবেষণায় পাওয়া গেছে নয়টি গোত্রের ৮৭ প্রজাতি।

দুই গবেষণায় প্রজাতি ও গোত্রের সংখ্যায় এ পার্থক্য থাকলেও শুধু এ সংখ্যা দিয়ে প্রজাপতির বৈচিত্র্য কমে গেছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না বলে মনে করেন গবেষকরা। কারণ গবেষণার সময়কাল, নমুনা সংগ্রহের স্থান, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের পার্থক্য ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগের গবেষণার সঙ্গে বর্তমান গবেষণার তুলনা করতে হলে গবেষণা পদ্ধতি ও নমুনা সংগ্রহের পরিধি বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান গবেষণায় শুধু প্রজাপতির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়নি; কোন কোন উদ্ভিদে তারা ডিম পাড়ে এবং সেসব উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে গবেষণার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে কিছু প্রজাতি বর্তমান তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাও হয়ে থাকতে পারে।’

কাপ্তাইয়ের বনাঞ্চলে প্রজাপতির আবাসস্থল রক্ষার ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন। তাঁর মতে, বনাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, জুম চাষ ও কাঠ আহরণের প্রবণতা বাড়লে প্রজাপতির আবাসস্থল এবং ডিম পাড়ার উপযোগী গাছপালা ও গুল্মলতা কমে যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘বনাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, জুম চাষ ও কাঠ আহরণের প্রবণতা বাড়লে প্রজাপতির আবাসস্থল এবং ডিম পাড়ার উপযোগী গাছপালা ও গুল্মলতা কমে যেতে পারে। বনভূমির পরিবর্তন, বৃক্ষনিধন, আগুন, দূষণ এবং ভূমির ব্যবহার বদলে যাওয়ার মতো বিষয়ও প্রজাপতির আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এসব পরিবর্তনে কোনো কোনো পোষক উদ্ভিদের বিস্তৃতি সংকুচিত হলে তার ওপর নির্ভরশীল প্রজাপতির খাদ্য ও প্রজননের সুযোগও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের এ গবেষণা তাই শুধু ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতি কিংবা ১০৩ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদের তালিকা নয়; এটি বনজ বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক নির্ভরশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র। একটি প্রজাপতির অস্তিত্ব যে একটি নির্দিষ্ট গাছ, লতাগুল্ম কিংবা পাতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, গবেষণাটি সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

বনের সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি এর প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করাও যে সংরক্ষণের অপরিহার্য অংশ, কাপ্তাইয়ের এই গবেষণা সেই বার্তাই দিচ্ছে। কারণ একটি বন তখনই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত থাকে, যখন তার গাছপালা, পোকামাকড়, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী নিজ নিজ জীবনচক্র সম্পন্ন করার সুযোগ পায়।