তানভীর রায়হান:
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার বাড়লেও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না দেশের অর্থনীতি। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় শ্রমবাজারে বাড়ছে চাপ। বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকার। অন্যদিকে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশই নিয়োজিত রয়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। সব মিলিয়ে দেশের শ্রমবাজারে ক্রমেই প্রকট হচ্ছে কাঠামোগত সংকট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত ডিগ্রি ও দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সামঞ্জস্য না থাকায় চাকরিপ্রার্থী ও কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও সে অনুযায়ী উৎপাদনশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েটকে কাজে যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে অর্থনীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষিতে, ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিল্পে এবং ৩৯ শতাংশ সেবা খাতে নিয়োজিত। এ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত শিল্প খাত এখনো দেশের শ্রমশক্তির তুলনামূলক কম অংশকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে পারছে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আধিক্যের কারণে স্থায়ী চাকরি, ভালো মজুরি ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক ০৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশের উপযোগী হলেও তাদের বিপরীতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অনেক কম। বছরে মাত্র সাত থেকে আট লাখ তরুণ কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছেন। তাদেরও প্রায় ৮৪ শতাংশ কাজ করছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে।
ফলে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতার তুলনায় দ্রুত বাড়ছে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ বেকার, যা মোট বেকারের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘গ্র্যাজুয়েটিং ইনটু আনসার্টেনটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন উচ্চশিক্ষিত তরুণের মধ্যে প্রায় ৩৬ জন বেকার। এ হার সামগ্রিক যুব বেকারত্বের হারের সাড়ে তিন গুণেরও বেশি।
আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার বেশি। ইন্দোনেশিয়ায় এ হার প্রায় ১৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১৬, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ১৩, ফিলিপাইনে ১২ এবং সিঙ্গাপুরে আট শতাংশ। তবে ভারতে এ হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, প্রায় ৪২ শতাংশ।
চাকরির বাজারে বাড়তি চাপের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় আবেদনকারীর সংখ্যায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টালে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি প্রার্থী আবেদন করছেন।
কভিড-১৯ মহামারীর আগের সময়ে একই ধরনের চাকরিতে গড়ে ১৭৩ জন আবেদন করতেন। সে হিসাবে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। এতে কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতাও তীব্র হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটটি শুধু চাকরির পদসংখ্যা কম থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এমন অনেক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছেন, যাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সামঞ্জস্য নেই। একই সঙ্গে প্রচলিত দাপ্তরিক চাকরির প্রতি সামাজিক আগ্রহের কারণে অনেক শিক্ষিত তরুণ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পেশায় যেতে আগ্রহী নন।
উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে ‘মিসঅ্যালোকেশন অব রিসোর্স’ বা সম্পদের অদক্ষ বণ্টন হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার পেছনে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, প্রতিবছর উচ্চশিক্ষা শেষ করে যতসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন, সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়েও তাদের জন্য তত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
রাজ্জাক বলেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষার পেছনে সরকার যে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করছে সেটি সম্পদের অদক্ষ বণ্টন। যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার আউটপুট দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছর দেশে যে পরিমাণ গ্র্যাজুয়েট উচ্চশিক্ষা শেষ করে বের হচ্ছেন, সে পরিমাণ চাহিদা সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে নেই। শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি তৈরি করা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশে কারিগরি, কেয়ার গিভার, ডিপ্লোমা ও আইটি খাতে দক্ষ জনবল দরকার। কিন্তু উচ্চশিক্ষিতরা এসব পেশায় যেতে চান না। আরেকটি বড় সমস্যা শিক্ষার গুণগত মানের অভাব। শিক্ষা ব্যবস্থায় যেসব বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো চাকরির বাজারের জন্য উপযোগী নয়।’
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্তারের ফলে চাকরির ধরন ও দক্ষতার চাহিদা বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শ্রমবাজারের এ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের পরিবর্তনশীল জনমিতিক কাঠামো। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিল কর্মক্ষম বয়সী।
তবে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন হাইলাইটস ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা কমে ৩ কোটি ১০ লাখে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে মোট জনসংখ্যায় তরুণদের অংশ ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে। বিপরীতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের অংশ বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
জনসংখ্যার এ পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সময় সীমিত হয়ে আসছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকার অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষিত ও কম শিক্ষিত—উভয় শ্রেণির বেকারদের এ পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান।
তিনি বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকার দুই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একটি হলো শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। অন্যটি আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহায়ক প্রশিক্ষণ।
তিনি বলেন, ‘দুই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমই বর্তমানে চালু রয়েছে। পাশাপাশি এগুলো আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
ইএআরএন প্রকল্পের আওতায় তিন বছরে আট লাখ তরুণকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৬০০ জনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন।
পাশাপাশি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
মাহফুজুল আলম খান বলেন, ‘যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ছাড়াও আরো অনেক প্রতিষ্ঠান তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে। সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের বৃহত্তর কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে।’
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকট এখন শুধু বেকারের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। বরং অর্থনীতি কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে, শিক্ষার মান কতটা উন্নত হচ্ছে এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের দক্ষ করে তোলা যাচ্ছে কিনা—এসব প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।