তানভীর রায়হান:
একসময় কেনাকাটার পাশাপাশি মানুষের আড্ডা ও অবসর কাটানোর অন্যতম জায়গা ছিল রাজধানীর বড় শপিং মলগুলো। ঈদ, উৎসব কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসব বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড় থাকত চোখে পড়ার মতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ব্যয় সংকোচন, অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে একের পর এক শপিং মলে কমছে ক্রেতা ও বিক্রি। কোথাও বিক্রি নেমেছে আগের অর্ধেকে, কোথাও পাঁচ বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। লোকসান সামলাতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেকে।
রাজধানীর শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যাওয়া এ সংকটের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। একসময় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের কাছে পরিচিত এ বিপণিবিতানে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও গয়নার দোকান ছিল। ১৯৯৮ সালে নির্মিত ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারতলা নিয়ে চালু হয়েছিল শপিং কমপ্লেক্সটি। কিন্তু ক্রেতা ও বিক্রি কমতে থাকায় শেষ পর্যন্ত এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দোকানমালিকদের অনেকেই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কেবল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি নয়, রাজধানীর পুরনো ও অভিজাত বিপণিবিতানগুলোর অনেকগুলোতেই এখন একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজা, এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা, মৌচাকের হোসাফ টাওয়ার ও মৌচাক মার্কেট, গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ড এবং মিরপুরের শাহ আলী মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মলে ক্রেতাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় কম। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিক্রি কমলেও দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ফলে অনেকের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসময় আধুনিক বিপণিবিতানের ধারণা জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজা। চলন্ত সিঁড়ি, লিফট এবং একই জায়গায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার সুবিধার কারণে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল এটি। টেলিভিশনেও প্রচারিত হতো বিপণিবিতানটির বিজ্ঞাপন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজধানীতে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন নতুন শপিং মলের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটায় আগ্রহী হয়েছেন ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব কারণে ইস্টার্ন প্লাজার আগের আকর্ষণ কমেছে।
সম্প্রতি বিপণিবিতানটি ঘুরে দেখা যায়, নিচতলায় প্রসাধনী, পোশাক ও খেলার সামগ্রীর দোকান থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম। ওপরের তলাগুলোতে বেশ কিছু দোকানের শাটার বন্ধ। কোনো কোনো দোকান দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে রয়েছে। বিক্রেতাদের অনেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কিংবা গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য কেনেন। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল্যছাড় ও অফারও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে নতুন নতুন শপিং মল তৈরি হওয়ায় পুরনো বিপণিবিতানগুলোকে ক্রেতা টানতে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় কেউ ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করছেন, কেউ দোকান ছাড়ছেন। আবার কেউ মূল্যছাড় ও অন্যান্য কৌশলে ক্রেতা ফেরানোর চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন মনে করেন, শপিং মল বন্ধের সময়সীমা কমিয়ে আনা ক্রেতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ‘শপিং মলগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রি কমে যাওয়ার মূল কারণ মূলত সময়সীমা কমিয়ে আনা। শপিং মলগুলোর বিক্রির পিক টাইম সন্ধ্যাবেলা। কিন্তু এসব মল খোলা রাখার সময়সীমা রাত ৮টা পর্যন্ত, যে কারণে ক্রেতা কমে যাচ্ছে। এর বাইরে আরো একটি কারণ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। আমরা দোকান খোলা রাখার সময়সীমা আরো ১ ঘণ্টা বাড়ানোর জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাতে অন্তত ক্রেতা সমাগম মার্কেটগুলোতে বাড়লে ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন।’
এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকাতেও ক্রেতা সংকটের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পোশাক, শাড়ি, বিয়ে ও প্রসাধনী সামগ্রীর জন্য পরিচিত এ বিপণিবিতানে এখন আগের মতো ভিড় নেই। নিচতলার কালার কসমেটিকসের বিক্রেতা নুসাইবা বলেন, ‘বেচাবিক্রি তেমন নেই। এর একটি বড় কারণ দ্রুত মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়া। আগে দেখা যেত, চাকরিজীবীরা বাসায় গিয়ে ৮টার দিকে মার্কেটে এসে ১০টা পর্যন্ত কেনাকাটা করতেন। কিন্তু এখন ৮টায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতা পাচ্ছি না।’
ওই বিপণিবিতানের আরেক ব্যবসায়ী জানান, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ উপলক্ষে বিক্রি কিছুটা বাড়ে। তবে বছরের অন্য সময়কে তারা অফ সিজন হিসেবে বিবেচনা করেন। এ সময়ে বিক্রির আয় দিয়ে মূলত দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন মেটানোর চেষ্টা করেন।
মৌচাক এলাকার বিপণিবিতানগুলোতেও ক্রেতার উপস্থিতি কম। ফরচুন শপিংয়ের একটি জুতার দোকানের বিক্রয়কর্মীর ভাষ্য, আগে মাসে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি পণ্য বিক্রি হতো। এখন বিক্রি নেমে এসেছে তার অর্ধেকেরও নিচে। কোনো কোনো দিন বিক্রির খাতাই খোলা যায় না।
একই বিপণিবিতানের এসডি কসমেটিকস কর্নারের বিক্রয়কর্মী মনির হোসেন বলেন, ‘আমদানি করা যেসব পণ্যের দাম আগে ১ হাজার টাকা ছিল, সেগুলোর দাম এখন ১ হাজার ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে সামান্য মুনাফা যোগ করতেই দাম অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল, দোকান ভাড়া ও সার্ভিস চার্জও বাড়ছে। পণ্যের সঙ্গে এসব ব্যয় যুক্ত হলে অনেক বেশি দাম পড়ে যাচ্ছে। ক্রেতারা দাম শুনলেই কেনার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন।’
হোসাফ টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সেও বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দোকান পরিচালনায়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে নিচতলার অনেক দোকান বন্ধ দেখা যায়। দোতলার করিডোরেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল কম। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ থাকায় ক্রেতাদের চলাচলে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানান জননী ক্লথ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোফাজ্জল হোসেন শরীফ। তিনি বলেন, বিক্রি অর্ধেকের নিচে নেমেছে। কোনো কোনো দিন একটি সুতা পর্যন্ত বিক্রি হয় না।
মৌচাক মার্কেটের রাজ ফ্যাব্রিকসের বিক্রয়কর্মী সাইফুল ইসলাম জানান, পূজার সময় কিছুটা বিক্রি হলেও বর্তমানে বেচাকেনা নেই। মানুষের আয়ের বড় অংশ খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে পোশাক, প্রসাধনী ও গয়নার মতো পণ্য অনেকের কাছে এখন বিলাসী কেনাকাটায় পরিণত হয়েছে।
গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ডেও ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো নয়। একসময় শুক্রবার ও শনিবার বিপণিবিতানটিতে ক্রেতাদের ব্যাপক সমাগম হতো। এখন সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, পাঁচ বছর আগের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। কারও কারও মতে, বর্তমান পরিস্থিতি করোনা মহামারির সময়ের চেয়েও খারাপ।
সম্প্রতি পুলিশ প্লাজা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন তলায় দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। পোশাক, জুতা ও ফ্যাশনসামগ্রীর দোকানগুলোতে মূল্যছাড় ও নানা অফার চললেও অধিকাংশ দোকানে ক্রেতা ছিল হাতে গোনা। ব্যবসায়ীরা জানান, এখন অনেকেই কেনাকাটার পরিবর্তে ঘোরাঘুরি ও বিনোদনের জন্য শপিং মলে আসেন। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
পুলিশ প্লাজায় কেনাকাটা করতে আসা নুসরাত জাহান বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পণ্যের দাম ও অফার তুলনা করার সুযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে কম দামে পণ্য পাওয়া যায়। এ কারণে ক্রেতাদের একটি অংশ এখন সরাসরি শপিং মলে যাওয়ার বদলে অনলাইনে কেনাকাটা করছেন।
মিরপুর-১০ এলাকার শাহ আলী মার্কেটেও ব্যবসায়ীদের একই অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি সিটি করপোরেশন ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করায় ক্রেতারা বিপণিবিতানমুখী হবেন বলে আশা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত বিক্রি বাড়েনি। ফ্যাশন, কাপড়, ক্রোকারিজ ও জুয়েলারির দোকানগুলোতেও ক্রেতা সংকট রয়েছে।
শাহ আলী প্লাজার নিচতলার মাহিম ক্রোকারিজ গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী মো. জসীম উদ্দিন জানান, সেদিন সকাল থেকে একজন নারী চাকরিজীবী ১ হাজার ৬৫০ টাকার পণ্য কিনেছেন। এটিই ছিল তার দোকানের উল্লেখযোগ্য বিক্রি।
প্লাজার তৃতীয় তলার বোম্বে কালেকশনের স্বত্বাধিকারী মো. মঈন উদ্দিন ২০০৩ সাল থেকে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক জীবনে বেচাকেনার এমন দুরবস্থা আর দেখেননি। কয়েক মাস ধরে বিক্রি নেই বললেই চলে। অথচ মাসে প্রায় ১৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। এর সঙ্গে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের খরচ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।’
মিরপুরের বেনারশী পল্লীতেও ক্রেতা সংকটের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শাড়ি ও বস্ত্রের জন্য পরিচিত এ এলাকার রেসা বেনারশীর বিক্রয় প্রতিনিধি মো. সোহাগ বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তুলনামূলক বেশি ক্রেতা আসার কথা থাকলেও এখনো বিক্রির খাতা খুলতে পারিনি।’
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে স্পষ্ট, রাজধানীর শপিং মলগুলোর সংকট শুধু ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে অনলাইন কেনাকাটা ও নতুন বিপণিবিতানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতাদের ব্যয় কমানো এবং দোকান পরিচালনার বাড়তি খরচ—সব মিলিয়ে পুরনো ও নতুন উভয় ধরনের শপিং মলেই ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। বিক্রি না বাড়লে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন মেটাতে না পেরে আরও ব্যবসায়ীকে দোকান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।