https://cns24news.com/

এইচএসসিতে ছেলেদের ফল বিপর্যয়, পড়াশোনায় অনাগ্রহ বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ: 02 Nov 2026   |   প্রতিবেদক: editor
এইচএসসিতে ছেলেদের ফল বিপর্যয়, পড়াশোনায় অনাগ্রহ বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

তানভীর রায়হান:

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে ছেলেরা। উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার সর্বশেষ ফলাফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পাসের হারে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফলাফল উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নজরদারির ঘাটতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৯১ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন। ফলে ছেলেদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি ছাত্র উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

গত বছরও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো ফল করেছিল। ২০২৫ সালে ছাত্রদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, আর ছাত্রীদের ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছর ধরেই ছেলেদের ফলাফল মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

ফলাফলের বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে খারাপ চিত্র পাওয়া গেছে মানবিকে। এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক ০১ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে মানবিকের ছাত্রদের পাসের হার সর্বনিম্ন, ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ। একই বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ৪৬ দশমিক ০৫ শতাংশ।

এ ছাড়া যশোর বোর্ডে মানবিকের ছাত্রদের পাসের হার ৩০ দশমিক ৬৫, বরিশালে ৩০ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৮৯, দিনাজপুরে ৩৩ দশমিক ১৯, কুমিল্লায় ৩৩ দশমিক ৬৭, ময়মনসিংহে ৩৯ দশমিক ৩৭ এবং সিলেটে ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে এ হার সর্বোচ্চ ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, পড়াশোনায় মনোযোগের ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। নারী শিক্ষায় সরকারের বিশেষ গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবার থেকেও মেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে তুলনামূলক বেশি তদারকি করা হয়।

তিনি বলেন, কভিডকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির ক্ষেত্রে শিথিলতা তৈরি হয়েছিল। ওই সময় থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিংনির্ভরতা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও শিক্ষাঙ্গনে আন্দোলনের প্রভাবেও পড়াশোনায় অমনোযোগিতা তৈরি হয়, যার প্রভাব ছেলেদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে।

তাঁর মতে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব কমে যাওয়ায় অনেক ছাত্রের মধ্যে নিয়মিত পড়াশোনার পরিবর্তে আড্ডা ও কোচিংনির্ভর প্রস্তুতির মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

তবে বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের ফল তুলনামূলক ভালো। এ বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে এ হার সর্বোচ্চ ৮০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হওয়ার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশের প্রভাবও রয়েছে। মাদারীপুরের একটি বেসরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে জহিরুল ইসলাম। তার মা রেবেকা আকতার জানান, কলেজে ভর্তির পর থেকেই ছেলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। মুঠোফোন ও রাজনীতিতে সময় দিতে গিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ হারায় সে। বাড়িতে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করেও পরিস্থিতির পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।

রেবেকা আকতার বলেন, ছেলেকে পড়াশোনায় ফেরানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে দেশের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও মুঠোফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আকতার বানু মনে করেন, করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার বিস্তার, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং অটো পাসের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অভ্যাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা ওভারমার্কিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্যাপ্ত পড়াশোনা ছাড়াই ভালো ফল করার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এতে অধ্যবসায় ও গভীরভাবে পড়ার আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আন্দোলন, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং কোচিং সেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের কারণে তুলনামূলক কম দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং, মাদক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরেই ছাত্রদের ফলাফল নিম্নমুখী। পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের নজরদারির ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে সরকার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মাদকাসক্তি প্রতিরোধের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনারও প্রত্যাশা রয়েছে।