https://cns24news.com/

রাজনৈতিক স্বার্থে রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল আওয়ামী লীগ: সেমিনারে বক্তারা

প্রকাশের তারিখ: 03 Nov 2026   |   প্রতিবেদক: editor
রাজনৈতিক স্বার্থে রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল আওয়ামী লীগ: সেমিনারে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালানো এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন লেখক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও পরবর্তী সময়ে এসব ঘটনার যথাযথ বিচার হয়নি।

সোমবার (২ নভেম্বর) জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর দ্বিতীয় পর্বে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘রক্ষীবাহিনী ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক এ সেমিনারে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু এভাবে দেখলে ১৯৭২ সাল থেকে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আড়ালে থেকে যায়।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের দখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারে বাহিনীটি ভূমিকা রাখলেও একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। সে সময় রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের বড় শিকার ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নেতাকর্মীরা।

বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭৫ সালের পর রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা উচিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলো এ বাহিনীকে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও বিচারের উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করেননি।

মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, রক্ষীবাহিনী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালাত। জাসদসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা বেশি ছিল, এমন এলাকাগুলোতে বাহিনীটির তৎপরতাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

তিনি আরও বলেন, রক্ষীবাহিনীর পোশাকের সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের মিল থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে শামসুন নাহার হলের মধ্যবর্তী সড়কে অনেক বেওয়ারিশ মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যেত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ধারণা, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এসব মরদেহ সেখানে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে।

সেমিনারের আলোচক লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র উদ্‌ঘাটনে একটি স্বাধীন ট্রুথ কমিশন গঠনের দাবি জানান। তিনি বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে গত পাঁচ দশকে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সত্য উদ্‌ঘাটনে এ ধরনের কমিশন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রক্ষীবাহিনী থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধেও অস্ত্র উদ্ধার ও আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর একই ধরনের বর্ণনা সামনে আনার অভিযোগ রয়েছে। আত্মরক্ষা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে এক করে দেখার প্রবণতা আইনের দুর্বলতাগুলোও সামনে নিয়ে আসে।

সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষের কাছে ভীতিকর দুটি নাম ছিল রক্ষীবাহিনী ও বাকশাল। অতীতের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ঘটনাগুলো পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে জাদুঘরটি এ সেমিনার সিরিজ আয়োজন করছে। এর প্রথম পর্বে বাকশাল এবং দ্বিতীয় পর্বে রক্ষীবাহিনী নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময় নিয়ে দলিলপত্র, বই ও সংবাদপত্রে অনেক কাজ থাকলেও ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময় নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই।

এহসান মাহমুদ আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে হলে অতীতের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। স্বাধীনতার পর এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সংবাদপত্র বন্ধ এবং রক্ষীবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সেমিনারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আয়োজকেরা জানান, ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর পরবর্তী পর্বগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে।