সম্পাদকীয়:
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রতিবছরই আমরা পাসের হার, জিপিএ-৫ এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করি। কেউ শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী বলেন, কেউ শিক্ষকদের দায়ী করেন, আবার কেউ অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবকে সামনে আনেন। কিন্তু এবার ফল বিপর্যয়ের পর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছে? নাকি তারা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কৌশল শিখছে?
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ফলাফলের এমন বড় পরিবর্তন নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে শুধু পাসের হার কমে যাওয়াকে সংকটের পূর্ণ চিত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এই ফল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা সমস্যাগুলো অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করল, তা দিয়ে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে পারছে, নিজের ভাষায় কতটা ব্যাখ্যা করতে পারছে, বাস্তব জীবনের সমস্যায় অর্জিত জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারছে—এসবও বিবেচনায় নিতে হবে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার নম্বরই হয়ে উঠেছে মেধা ও যোগ্যতার প্রধান পরিচয়।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার অভ্যাস দুর্বল হয়ে পড়া। পাঠ্যবই বোঝার পরিবর্তে তারা নির্ভর করছে গাইড বই, নোট, প্রশ্নব্যাংক ও কোচিংয়ের ওপর। কোন প্রশ্ন আসতে পারে, কোন উত্তর লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে—এটাই প্রস্তুতির প্রধান কৌশল। ফলে প্রশ্নের ধরন সামান্য পরিবর্তিত হলেই অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়ে। মুখস্থনির্ভরতার এই দুর্বলতা সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালুর পরও দূর হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরও মুখস্থ করার নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এখানে শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। যে ব্যবস্থায় ভালো ফলের জন্য অভিভাবক কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করেন, শিক্ষককে নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করার চাপ নিতে হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করা হয়, সেখানে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতা আশা করা কঠিন। অর্থাৎ সমস্যাটি ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক।
শিক্ষার আরেকটি বড় সংকট হলো সুযোগ ও মানের বৈষম্য। শহরের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও সহায়ক পরিবেশের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষাসামগ্রীর অভাব, আবার কোথাও নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। সব শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলেও তাদের শেখার সুযোগ যে সমান, তা বলা যায় না। তাই ফল বিশ্লেষণের সময় অঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল এবং শিক্ষকদের প্রাপ্যতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও প্রযুক্তির বিস্তারে কর্মজগতের চাহিদা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শুধু মুখস্থবিদ্যা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, দলগত কাজ, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এসব দক্ষতা পরীক্ষার খাতায় কয়েকটি নির্ধারিত উত্তর লিখে পুরোপুরি যাচাই করা যায় না।
তাই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন জরুরি। চূড়ান্ত পরীক্ষার পাশাপাশি ধারাবাহিক মূল্যায়ন, ব্যবহারিক কাজ, প্রকল্প, মৌখিক উপস্থাপনা ও বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধানের সুযোগ বাড়াতে হবে। তবে নতুন পদ্ধতি চালুর আগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সংস্কারের নামে কেবল পরীক্ষার কাঠামো বদলাবে, শিক্ষার মান বদলাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষা সংস্কারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওঠানামার বাইরে রাখতে হবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক, সবাই অনিশ্চয়তায় পড়েন। শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। এর পরিকল্পনা করতে হবে গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
এইচএসসির ফল বিপর্যয়কে তাই কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার তালিকা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি আমাদের নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ। শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়, তাকে চিন্তাশীল, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হলে পাসের হার বাড়িয়েও প্রকৃত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে না। প্রশ্ন এখন শুধু কতজন পাস করল, তা নয়; বরং আমাদের শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে।