তানভীর রায়হান:
রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন ৬/১ ও ৬/২ আর কে মিশন রোডে নির্মিত ১০ তলা আবাসিক ভবন ‘ম্যাম কিংডম’-এ অনুমোদিত নকশার ১১ ধরনের ব্যত্যয় চিহ্নিত করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এসব অবৈধ অংশ সাত দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়ে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভবন মালিককে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নোটিশ দেওয়ার পর প্রায় দুই বছর হতে চললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উচ্ছেদ বা অপসারণ কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ করে ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তর শুরু করেছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান টোটাল রিয়েল এস্টেট লিমিটেড। ফলে নকশার ব্যত্যয় ও রাজউকের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ফ্ল্যাটের মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রাজউকের জোন ৬/১-এর তৎকালীন অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন ভবনটির মালিক মো. আহমদ আরেফিন তালুকদার গংকে ওই নোটিশ দেন। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ অংশ অপসারণ না করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
রাজউক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৬/১ ও ৬/২ আর কে মিশন রোডের জমির মালিক মো. আহমদ আরেফিন তালুকদার গংয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর একটি বেজমেন্টসহ ১০ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় রাজউক। অনুমোদিত নকশার স্মারক নম্বর রাজউক/নঅঅ/৩সি-৪-০৫২১/০৯/৭২৩। ভবনটির নির্মাণকাজ তদারকি করছে টোটাল রিয়েল এস্টেট লিমিটেড।
অনুমোদন পাওয়ার প্রায় ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ফ্ল্যাটের দখল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্মাণকাজের ধীরগতি ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়সহ বিভিন্ন কারণে ল্যান্ড ওনার ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন। কয়েকজন মালিককে ফ্ল্যাটের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্রেতা এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বছরের পর বছর অর্থ বিনিয়োগের পরও নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাটে উঠতে না পারার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
রাজউকের নোটিশে উল্লেখ করা ১১ ধরনের ব্যত্যয়ের মধ্যে রয়েছে ভবনের পেছনের রাস্তার জন্য নির্ধারিত জায়গা না ছাড়া, সিঁড়ির প্রস্থ কমানো, নকশার বাইরে বারান্দা ও স্ল্যাব সম্প্রসারণ, নির্ধারিত খোলা জায়গা কম রাখা এবং ছাদে অতিরিক্ত কক্ষ নির্মাণ।
নোটিশ অনুযায়ী, ভবনের পেছনের রাস্তার জন্য নকশায় ১ দশমিক ৭৯ মিটার × ৭ দশমিক ২১ মিটার জায়গা ছাড়ার শর্ত থাকলেও বাস্তবে তা রাখা হয়নি। ভবনের ডান পাশের সিঁড়ির অনুমোদিত প্রস্থ ১ দশমিক ১৫ মিটার হলেও সরেজমিনে পাওয়া গেছে ০ দশমিক ৬৩ মিটার।
এ ছাড়া ভবনের সামনের দিকে নকশার বাইরে ১ দশমিক ৮০ মিটার × ১ দশমিক ২২ মিটার আয়তনের তিনটি বারান্দা বাড়ানো হয়েছে। বাম পাশেও অনুমোদিত নকশার বাইরে ১ দশমিক ৫০ মিটার × ৬ দশমিক ৭০ মিটার আয়তনের বারান্দা নির্মাণ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ভবনের বাম পাশে অনুমোদিত নকশার বাইরে প্রায় ১ দশমিক ১৪ মিটার টানা স্ল্যাব সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একইভাবে ডান পাশে প্রায় ১ দশমিক ৬০ মিটার এবং পেছনের দিকে ০ দশমিক ৬৭ মিটার × ৩ দশমিক ০৪ মিটার আয়তনের স্ল্যাব বাড়ানো হয়েছে।
ভবনের বাম পাশের নির্ধারিত খোলা জায়গার ক্ষেত্রেও নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের পার্থক্য পাওয়া গেছে। অনুমোদিত নকশায় ভবনের মাঝখানে ২ দশমিক ৫০ মিটার × ২ দশমিক ৬০ মিটার আয়তনের ভয়েড বা খোলা জায়গা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৮০ মিটার × ১ দশমিক ১৬ মিটার।
এ ছাড়া ছাদে অনুমোদিত নকশার বাইরে ৭ দশমিক ৩৯ মিটার × ৯ দশমিক ৬০ মিটার আয়তনের একটি জিম রুম এবং ৫ দশমিক ৩৩ মিটার × ১০ দশমিক ০৫ মিটার আয়তনের একটি কমিউনিটি রুম নির্মাণ করা হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নোটিশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রাজউক জোনের কর্মকর্তারা ভবনটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই জোনে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে ছয় থেকে সাতজন এবং অথরাইজড অফিসার হিসেবে অন্তত পাঁচজন দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এত দীর্ঘ সময়ে ভবনটির নির্মাণকাজে এসব ব্যত্যয় কেন শনাক্ত হয়নি, সে প্রশ্নও উঠেছে।
এদিকে নোটিশ জারির পরও ভবনটির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া এবং ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তর শুরু হওয়ায় রাজউকের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনের অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বিষয়টি বিবেচনায় আছে। যেকোনো সময় ওই এলাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।”
তবে নোটিশ দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কেন উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টোটাল রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ভবনটির ল্যান্ড ওনার ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ভোগান্তি এবং তাঁদের অভিযোগ নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।