ফিচার ডেস্ক:
বাড়ির ভেজা দেয়াল, ছাদের কোণ কিংবা পুরোনো ইটের গায়ে সবুজ শেওলা জন্মাতে দেখলে অনেকেই তা পরিষ্কার করে ফেলেন। অনেকের কাছে এটি অপরিচ্ছন্নতা বা অবহেলার চিহ্ন। তবে প্রকৃতিতে শেওলার ভূমিকা শুধু দেয়াল ঢেকে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর্দ্রতা ধরে রাখা, ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাস তৈরি এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এই ছোট্ট উদ্ভিদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
শেওলা সাধারণত আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত পরিবেশে ভালো জন্মায়। মাটির পাশাপাশি পাথর, ইট, গাছের গুঁড়ি এমনকি দেয়ালের মতো বিভিন্ন পৃষ্ঠেও এদের দেখা যায়। পরিচিত অনেক উদ্ভিদের মতো শেওলার প্রকৃত শিকড় নেই। এর পরিবর্তে বিশেষ ধরনের সূক্ষ্ম গঠনের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন পৃষ্ঠের সঙ্গে আটকে থাকে এবং পরিবেশ থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করে। অনুকূল পরিবেশ পেলে অল্প জায়গাতেও শেওলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেওলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পানি ধরে রাখার ক্ষমতা। বৃষ্টির পানি ও বাতাসের আর্দ্রতা শোষণ করে এরা নিজেদের মধ্যে পানি জমিয়ে রাখতে পারে। বনভূমিতে শেওলা মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং ক্ষুদ্র জীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। কিছু পরিবেশে শেওলার বিস্তার মাটিক্ষয় কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে অনেক প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে শেওলা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শেওলা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং খাদ্য তৈরি করে। তবে সাধারণ গাছপালার তুলনায় শেওলা চার গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, এমন দাবি সব প্রজাতি ও পরিবেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কার্বন শোষণের পরিমাণ নির্ভর করে শেওলার প্রজাতি, বিস্তারের পরিমাণ, পরিবেশগত অবস্থা এবং গবেষণার পদ্ধতির ওপর।
শহরের পরিবেশেও শেওলার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে কিছু সবুজ আচ্ছাদন আশপাশের তাপমাত্রায় সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাড়ির দেয়ালে জন্মানো শেওলা একাই শহরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে না। শহরকে শীতল রাখতে গাছপালা, জলাভূমি, ছায়া এবং পরিকল্পিত সবুজ পরিসর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাড়ির দেয়াল বা ছাদে শেওলা জন্মালে সব সময় তা রেখে দেওয়াও ঠিক নয়। দীর্ঘদিন ভেজা থাকা, পানি চুঁইয়ে পড়া কিংবা দেয়ালে ফাটল থাকার কারণে সেখানে শেওলা জন্মাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শেওলা পরিষ্কারের পাশাপাশি আর্দ্রতার উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। এ ছাড়া শেওলাযুক্ত পৃষ্ঠ পিচ্ছিল হয়ে হাঁটাচলার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রকৃতির ছোট ছোট উপাদানও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেওলা তারই একটি উদাহরণ। একে শুধু অপরিচ্ছন্নতার চিহ্ন হিসেবে না দেখে এর পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোথায় শেওলা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে আর কোথায় তা পরিষ্কার করা জরুরি, সেই পার্থক্য বুঝে চললেই প্রকৃতি ও বসতবাড়ি, উভয়ের যত্ন নেওয়া সম্ভব।