ড. মুহম্মদ ইদ্রিছ ভূইয়া:
আজকের দৃষ্টিনন্দন ১০০ ফুট প্রশস্ত মাদানী এভিনিউ দেখে হয়তো অনেকেই কল্পনা করতে পারবেন না, এই সড়কের সৌন্দর্য ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন এক ইতিহাস। সেখানে আছে ভূমি অধিগ্রহণ, উচ্ছেদ, মানুষের কান্না, প্রতিবাদ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং উন্নয়ন বাস্তবায়নের নানা প্রতিকূলতার স্মৃতি। একটি সড়কের নির্মাণ ও আধুনিকায়নের গল্পের আড়ালে এভাবেই কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রাম।
একসময় ভাটারা এলাকায় প্রগতি সরণির সংযোগস্থল থেকে বালু নদীর ওপর নির্মিত নড়িয়া সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার চিত্র ছিল আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানের মতো প্রশস্ত ও দৃষ্টিনন্দন সড়ক, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয়, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র তখন গড়ে ওঠেনি। সময়ের সঙ্গে নগরায়ণের বিস্তারে বদলে গেছে পুরো এলাকার চেহারা।
আজকের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড সিটি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দক্ষিণ প্রবেশপথ ও সংযোগ সড়ক, সাতারকুল, সোলমাইদ এবং মাদবরবাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক বিস্তার—সবই এই বৃহত্তর নগর সম্প্রসারণের অংশ। মাদানী এভিনিউ তাই কেবল একটি সড়ক নয়; এটি রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে নগরায়ণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে এই পরিবর্তন এক দিনে কিংবা নির্বিঘ্নে আসেনি। সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি 확보, সরকারি জমির অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
উন্নয়নের এই প্রক্রিয়ার বিপরীত পিঠে ছিল এক কঠিন মানবিক বাস্তবতা। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষের অভিযোগ ছিল, তাঁরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্বাসনের সুযোগ পাননি। কারও কাছে বসতবাড়িটি ছিল শেষ আশ্রয়, কারও ছোট ব্যবসাটি ছিল পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। ফলে উচ্ছেদের মুখে তাঁরা প্রতিবাদ করেছেন, বাধা দিয়েছেন, নিজেদের শেষ সম্বল রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের কাছে বিষয়টি ছিল শুধু জমি বা স্থাপনা হারানোর ঘটনা নয়; ছিল জীবনযাপনের পরিচিত ভিত্তি হারানোর আশঙ্কা।
এ ধরনের পরিস্থিতি মানবিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দেয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ও জীবিকার প্রশ্ন—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের জন্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়। কারণ, উন্নয়ন থেমে থাকলে নগরবাসীর দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন পূরণ বাধাগ্রস্ত হয়; আবার উন্নয়নের নামে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষিত হলে তা সামাজিক অসন্তোষ ও মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
আমি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের পরামর্শক হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছি। এ সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতায়, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন অযৌক্তিকভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, আবার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকারও যেন উপেক্ষিত না থাকে—এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত অবস্থান প্রয়োজন।
উন্নয়নকাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ থাকলেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করা যায় না। কেউ হয়তো ব্যক্তিস্বার্থে প্রকল্প বাধাগ্রস্ত করতে পারেন, আবার কেউ নিজের বসতভিটা বা জীবিকার শেষ অবলম্বন হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদ করেন। এই দুই বাস্তবতার পার্থক্য বোঝা জরুরি। প্রকল্পের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ শোনা, যথাযথ যাচাই, প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ এবং সম্ভব হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ মাদানী এভিনিউর দিকে তাকালে নগর উন্নয়নের দৃশ্যমান সাফল্য চোখে পড়ে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নগরজীবনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সড়ক রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ সহজ করেছে এবং আশপাশের নগরায়ণকে গতিশীল করেছে। কিন্তু আজকের সৌন্দর্য দেখে অতীতের মানুষের হাসি-কান্না, প্রতিবাদ ও ত্যাগের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল কংক্রিট, পিচঢালা সড়ক, সেতু কিংবা বহুতল ভবনের সমষ্টি নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ মানুষের জীবনমানের উন্নতি, নিরাপদ বসবাস, জীবিকার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। একটি প্রকল্পের সুফল যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সেই সুফল অর্জনের ভার যেন অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, বড় উন্নয়ন অনেক সময় সহজ পথে আসে না। প্রতিকূলতা, বিরোধিতা, জটিলতা এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। তবে দৃঢ়তা মানে মানুষের কষ্টকে অস্বীকার করা নয়; বরং বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, When the going gets tough, the tough get going. অর্থাৎ, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, দৃঢ়চেতা মানুষই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যায়।
মাদানী এভিনিউর বর্তমান সৌন্দর্য আমাদের নগর উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা বলে। আর এর অতীত মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের প্রতিটি দৃশ্যমান অর্জনের পেছনে মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকে। তাই ভবিষ্যতের নগর উন্নয়ন হতে হবে আরও পরিকল্পিত, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে উন্নয়নের গতি বজায় থাকবে, একই সঙ্গে মানুষের অধিকার ও মর্যাদাও সুরক্ষিত থাকবে।
-লেখক ও আইনী পরামর্শক