নিজস্ব প্রতিনিধি:
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড এখন তাওহিদ হৃদয়ের দখলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে মুশফিকুর রহিমের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের মালিক হয়েছেন হৃদয়।
তবে টেস্ট ক্রিকেটে বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের তালিকায় বাংলাদেশের এই অর্জন ছাড়াও রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি স্মরণীয় কীর্তি। কোনোটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে অক্ষত, কোনোটি আবার প্রায় ৯০ বছর ধরে টিকে আছে।
বিশ্ব ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্রায়ান লারা
টেস্ট ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড এখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটার ব্রায়ান লারার দখলে। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যান্টিগায় অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। টেস্টে ব্যক্তিগত সংগ্রহে চারশ ছোঁয়া একমাত্র ব্যাটারও লারা। প্রায় ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর এই রেকর্ড অক্ষত রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক ম্যাথিউ হেইডেন। ২০০৩ সালের অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৮০ রান করেছিলেন তিনি। সে সময় এটি টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের রেকর্ডও ছিল। তবে ছয় মাস পর লারা ৪০০ রানের ইনিংস খেলে সেই রেকর্ড নিজের করে নেন।
শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড মাহেলা জয়াবর্ধনের। ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৭৪ রান করেন তিনি। ওই ইনিংসে কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে তাঁর ৬২৪ রানের জুটি গড়ে ওঠে, যা টেস্ট ক্রিকেটে যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি হিসেবে পরিচিত।
দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ উইয়ান মুল্ডারের। ২০২৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৬৭ রানে অপরাজিত থাকা অবস্থায় ইনিংস ঘোষণা করেন তিনি। লারার ৪০০ রানের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেও তা ভাঙার চেষ্টা না করে ইনিংস ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় আসেন মুল্ডার।
ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রেকর্ড
ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড লেন হাটনের। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬৪ রান করেছিলেন তিনি। প্রায় ৮৮ বছর ধরে এই রেকর্ড অক্ষত রয়েছে। গ্রাহাম গুচ, অ্যান্ডি স্যান্ডহাম, জন এডরিচ এবং হ্যারি ব্রুকের মতো ব্যাটাররা বড় ইনিংস খেললেও হাটনের রেকর্ড ভাঙতে পারেননি।
পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ হানিফ মোহাম্মদের ৩৩৭ রান। ১৯৫৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্রিজটাউনে এই ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ইনজামাম-উল-হক ২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২৯ এবং ইউনিস খান ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩১৩ রান করলেও হানিফের রেকর্ড অক্ষত রয়েছে। তাঁর ৯৭০ মিনিটের ইনিংসটি টেস্ট ইতিহাসের দীর্ঘতম ব্যক্তিগত ইনিংস হিসেবেও বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ভারত, নিউজিল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের রেকর্ড
ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস বীরেন্দর শেবাগের। ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩১৯ রান করেন তিনি। এর আগে ২০০৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ভারতীয় হিসেবে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিলেন শেবাগ। পরে নিজের রেকর্ডই ছাড়িয়ে যান তিনি।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ৩০২ রান। ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে এই ইনিংস খেলেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটারও ম্যাককালাম।
জিম্বাবুয়ের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ডেভ হটনের। ১৯৯৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৬৬ রান করেছিলেন তিনি। এরপর অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গাই হুইটাল ও গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারের মতো ব্যাটাররা বড় ইনিংস খেললেও হটনের রেকর্ড অতিক্রম করতে পারেননি।
আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়
আফগানিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ হাশমতউল্লাহ শাহিদির ২৪৬ রান। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়েতে এই ইনিংস খেলেন তিনি। একই ম্যাচে রহমত শাহও ২৩৪ রান করেন। টেস্টে আফগানিস্তানের ব্যাটারদের ডাবল সেঞ্চুরির তিনটি কীর্তির মধ্যে দুটিই শাহিদির।
এবার বাংলাদেশের রেকর্ডের কথায় আসা যাক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে তাওহিদ হৃদয় দেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড গড়েছেন। এর আগে এই রেকর্ড ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রান করেছিলেন তিনি।
অন্যদিকে টেস্টে আয়ারল্যান্ডের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস কেভিন ও’ব্রায়েনের ১১৮ রান। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের অভিষেক টেস্টেই এই ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের কোনো ব্যাটার টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারেননি।
তাওহিদ হৃদয়ের ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন মাইলফলক। বিশ্বের অন্যান্য দেশের রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, টেস্ট ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের তালিকায় দেশভেদে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী কীর্তি ও নতুন অর্জনের গল্প। হৃদয়ের এই ইনিংসও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তেমনই একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।