বিশেষ প্রতিনিধি:
শিশুর হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়া ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন। সম্প্রতি ২১ পৃষ্ঠার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ভোলার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতির সন্তান বাসমিন আবরাব ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারে জন্ম নেয়। জন্মের কয়েকদিন পর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় শিশুটিকে সাভারের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১৯ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেয়া হয়।
রিটকারীর দাবি, আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তারা সাময়িকভাবে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন। পরে হাসপাতালে ফিরে আনুমানিক ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার বিলের কথা জানতে পেরে তারা ভোলায় ফিরে যান এবং অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির বাবা-মায়ের সন্ধান না পেয়ে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল।
এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক নিঃসন্তান দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের জিম্মায় নিতে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। রিটকারীর দাবি, মামলা দায়েরের ১০ দিনের মধ্যে তারা একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, হেফাজত ও পাসপোর্ট সংগ্রহের ডিক্রি পান।
শিশুটিকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রোজিনা আক্তার হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করেন। শুনানি শেষে আদালত শিশুটিকে তার গর্ভধারিণী মায়ের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে রুল জারি করেন।
তবে বিবাদীদের দাবি, শিশুটিকে তার বাবা-মা পরিত্যাগ করেছিলেন। তাদের বক্তব্য, হাসপাতালে প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন থাকার পরও শিশুটির বাবা-মায়ের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে শিশুটিকে সরকারি ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়। পারিবারিক আদালতের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই শিশুটির হেফাজত ও অভিভাবকত্বের ডিক্রি নেওয়া হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, শিশুটিকে সংকটজনক অবস্থায় ভর্তি করার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়। শিশুটির বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। পরে শিশুটি সুস্থ হলে ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।
হাইকোর্ট বলেন, শিশুটিকে বাবা-মা স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করেছিলেন, নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করেছিলেন—এটি একটি জটিল ও বিতর্কিত প্রশ্ন। রিটের সংক্ষিপ্ত শুনানির মাধ্যমে এ ধরনের বিতর্কিত তথ্যের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
রায়ে আদালত বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারায় পারিবারিক আদালতের আদেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। যখন বিশেষায়িত আইনে নির্দিষ্ট আপিলের ফোরাম রয়েছে, তখন সরাসরি হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা সমীচীন নয়।
এ কারণে হাইকোর্ট রিটে জারি করা রুল খারিজ করে দেন এবং এর আগে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন। তবে শিশুটির হেফাজত ও অভিভাবকত্ব নিয়ে গর্ভধারিণী মা উপযুক্ত পারিবারিক বা দেওয়ানি আদালতে আইনগত প্রতিকার চাইতে পারবেন বলে রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে।

