তানু রায়হান:
ঢাকায় মনোরেল চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য রুট খুঁজতে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনকে (বিআরটিসি) নিয়োগ দিচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এ সমীক্ষার জন্য আজ মঙ্গলবার ডিটিসিএ ও বুয়েটের মধ্যে চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
সমীক্ষার মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মনোরেলের জন্য উপযোগী রুট, স্টেশন ও ডিপোর সম্ভাব্য অবস্থান, যাত্রী চাহিদা, নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক, কারিগরি, পরিবেশগত ও সামাজিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেল এবং অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে মনোরেলের সংযোগের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।
সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী ঢাকায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল করিডর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বুয়েটের পরামর্শে সম্ভাব্য রুটের সংখ্যা বাড়িয়ে বর্তমানে মোট ১৪টি রুট যাচাই করা হচ্ছে। সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এসব রুটের মধ্য থেকে বাস্তবায়নযোগ্য একটি করিডর বাছাই করা হবে।
প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত পাঁচটি করিডরের মধ্যে রয়েছে—পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার, মধ্য বাড্ডা-ভুলতা ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার, রামপুরা-ডেমরা ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার, মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার এবং উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার।
তবে চূড়ান্ত রুট নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যমান প্রস্তাবিত করিডর বিবেচনা করা হবে না। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার যাত্রী চলাচলের ধরন, সড়কের সক্ষমতা, জনঘনত্ব এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সম্ভাব্য রুটও যাচাই করা হবে।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, সমীক্ষার মাধ্যমে প্রথমে সম্ভাব্য রুটগুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হবে। তিন মাসের মধ্যে উপযুক্ত করিডর চিহ্নিত করার লক্ষ্য রয়েছে। পুরো প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করার জন্য ছয় মাস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় মনোরেলের সম্ভাব্য স্টেশন ও ডিপোর অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি কোন এলাকায় কতসংখ্যক যাত্রী এই পরিবহন ব্যবহার করতে পারেন, তারও হিসাব করা হবে। একই সঙ্গে রুটের কারিগরি উপযোগিতা, অবকাঠামোগত চাহিদা, নির্মাণ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর এবং এর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, তাও মূল্যায়ন করা হবে।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের সঙ্গে মনোরেলের সমন্বয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মেট্রোরেল নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে স্টেশন থেকে যাত্রীদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ উন্নয়নে মনোরেল কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সমীক্ষায় তা খতিয়ে দেখা হবে।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত একটি মনোরেল রুট চালু করা।”
তিনি বলেন, শুরুতে পাঁচটি রুট নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও বুয়েটের পরামর্শে ১৪টি সম্ভাব্য রুট যাচাই করা হচ্ছে। এসব রুটের সুবিধা, যাত্রী চাহিদা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত রুট নির্বাচন করা হবে।
ডিটিসিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকায় নতুন ভারী গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে জায়গার সংকট রয়েছে। উড়ালপথে পরিচালিত হওয়ায় মনোরেল এসব এলাকায় বিকল্প হিসেবে কতটা কার্যকর হতে পারে, তাও সমীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নির্মাণ ব্যয়, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পরিমাণের ওপর প্রকল্পটির বাস্তবায়নযোগ্যতা নির্ভর করবে।
সমীক্ষার ফলাফলের আগে মনোরেলের চূড়ান্ত রুট বা সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে না। কোন করিডর যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হবে এবং কোন রুটে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব, তা সমীক্ষায় নির্ধারণ করা হবে।
ঢাকায় মনোরেল চালুর পরিকল্পনাটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেরও অংশ। প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে এবার সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর রুট নির্বাচন, প্রকল্প প্রণয়ন ও পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

