Homeজাতীয়মবের শিকার ১২০০ শিক্ষক, প্রতিকার চেয়ে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে

মবের শিকার ১২০০ শিক্ষক, প্রতিকার চেয়ে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে

তানভীর রায়হান:

অভিযোগের বিচার হওয়ার আগেই জনতার চাপের মুখে পদত্যাগ, লাঞ্ছনা কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার শিকার হয়েছেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এমন ঘটনার যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে, তার জের এখনো কাটেনি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অন্তত ১,২০০ শিক্ষক এখনো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় কোনো ডাটাবেজ না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিশ্চিত নয়।

চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য কেউ শিক্ষা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন, কেউ আদালতে গেছেন। অনেকে পুনর্বহালের নির্দেশ পেলেও বাস্তবে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কোথাও ব্যবস্থাপনা কমিটির আপত্তি, কোথাও স্থানীয় বিরোধ বা প্রভাবশালীদের বাধা, আবার কোথাও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে তাঁদের যোগদান। এ-সংক্রান্ত তিন শতাধিক মামলা হওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন মাউশির কর্মকর্তারা।

ফলে সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশের পরও অনেক শিক্ষককে চাকরি, বেতন-ভাতা ও কর্মস্থলে ফেরার নিশ্চয়তার জন্য এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।

জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু রাখার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু রাখা এবং ইএফটি ব্যবস্থায় তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ বাস্তবায়নে অসহযোগিতা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।

তবে মাঠপর্যায়ে এ নির্দেশের বাস্তবায়ন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা শিক্ষা ভবনের সামনে মানববন্ধন করে অভিযোগ করেন, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না এবং কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না।

শিক্ষকদের অভিযোগ, কোথাও ইএফটি তথ্য হালনাগাদ না করা, কোথাও এমপিও-সংক্রান্ত জটিলতা এবং কোথাও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে তাঁদের সংকট দীর্ঘ হচ্ছে।

জোরপূর্বক পদত্যাগের বৈধতা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন উঠেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদের মামলায় হাইকোর্ট জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রকে আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে উল্লেখ করে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন।

আদালতের এমন অবস্থানের পরও বাস্তবে অনেক শিক্ষক কেন কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন, মবের শিকার হয়ে কতজন শিক্ষক এখনো প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ না থাকায় বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলো তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

রাজধানীর আনন্দময়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগমের ঘটনাটি এ সংকটের একটি উদাহরণ। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

পরবর্তী তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় মাউশি তাঁর বেতন ছাড়ের ব্যবস্থা করে। কিন্তু এরপরও তিনি কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশাসনিক যোগাযোগের পাশাপাশি আদালতেরও দ্বারস্থ হয়েছেন।

নাজমা বেগমের মতো অন্য ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সমস্যাও শুধু চাকরিতে পুনর্বহালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন বেতন বন্ধ থাকা, বকেয়া বেতন-ভাতা, এমপিও ও ইএফটি জটিলতা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা হারানোর বিষয়গুলোও তাঁদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তির আগেই জনতার চাপের মুখে কোনো শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হলে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আবার সব ঘটনার চরিত্রও এক নয়। কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকার দাবিও রয়েছে। ফলে মবের শিকার হওয়ার অভিযোগকে ব্যবহার করে প্রকৃত অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ যেমন থাকা উচিত নয়, তেমনি অভিযোগের বিচার হওয়ার আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

প্রয়োজন অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত।

শিক্ষা প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মবের শিকার শিক্ষকদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ এবং তাঁদের বর্তমান অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা।

কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, কোথায় তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, কার পদত্যাগ স্বেচ্ছায় এবং কারটি জোরপূর্বক, কতজন পুনর্বহালের আদেশ পেয়েছেন, কতজন বেতন পাচ্ছেন এবং কতজন এখনো কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি, এসব তথ্য এক জায়গায় না থাকায় সমস্যাটির সামগ্রিক চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে না।

তাই প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় ও যাচাইযোগ্য ডাটাবেজ। একই সঙ্গে পুনর্বহালের সরকারি নির্দেশ ও আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে কোথায় বাধা তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কারণ একজন শিক্ষক পুনর্বহালের আদেশ পাওয়ার পরও যদি নিজের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে না পারেন, তাহলে শুধু আদেশ জারি করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই আদেশ বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়।

১,২০০ শিক্ষকের এই সংকট তাই শুধু চাকরি ফিরে পাওয়ার বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগের বিচার, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং আইনের শাসন কতটা কার্যকর, তারও একটি বড় পরীক্ষা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments