তানভীর রায়হান:
নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের জন্মশতবার্ষিকী রোববার, ১৮ অক্টোবর। অথচ তার পৈতৃক বাড়িটি এখনো বেদখলে, ধ্বংসের পথে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সরকারি গেজেট প্রকাশের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও বাড়ি ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। সংস্কারের অভাবে ভবনটির দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ভেঙে পড়েছে ছাদের অংশ। একসময়কার কারুকার্যমণ্ডিত বাড়িটি এখন হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের বাগুটিয়া গ্রামে অবস্থিত বাড়িটি। বর্তমান বাসিন্দারা বলছেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তারা বাড়ি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বাড়িটি সংরক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বলে দাবি তাদের। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই দীর্ঘদিনেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ইলা মিত্রের দাদা রাজমোহন সেন ১৮৯৯ সালে বাড়িটি নির্মাণ করেন। চুন-সুরকির তৈরি দোতলা ও একতলা দুটি ভবনে রয়েছে নয়টি কক্ষ এবং একটি প্রধান ফটক। শৈলকুপা উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাড়িটি একসময় ছিল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। তবে পূর্বপুরুষেরা দেশত্যাগের পর বাড়িটি অন্যদের দখলে চলে যায়। ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ জমিও বেহাত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
২০১৪ সালে বাড়িটি পুরাকীর্তি ও প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে ২০১৭ সালে বাড়িসহ ২২ শতাংশ জমিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ৪ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ করে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি।
বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় খোদাবক্স নামের এক ব্যক্তি বাড়িটি কিনেছিলেন। পরে তার সূত্রে হাজি কিয়াম উদ্দিন মালিকানা পান। ১৯৭০ সাল থেকে কিয়াম উদ্দিনের উত্তরসূরিরা সেখানে বসবাস করছেন বলে তাদের দাবি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির ছাদের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। চারপাশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। জরাজীর্ণ ভবন দুটিতে এখন বসবাস করছেন হাজি কিয়াম উদ্দিনের চার ছেলে আলী হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ ও রাশিদুল ইসলাম।
বর্তমান বাসিন্দাদের কয়েকজন বলেন, ‘আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিলে আমরা ছেড়ে দেব। প্রতিবছর আপনারা এসে আমাদের বিরক্ত ও হয়রানি করেন। আপনারা কেউ আর আসবেন না।’
ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায়। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল ছিলেন। মা মনোরমা সেন ছিলেন গৃহিণী। তাদের পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামে। শৈশবে কয়েকবার সেখানে এসেছিলেন ইলা মিত্র। আশপাশের গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দনপুর ও শাহাবাজপুর গ্রামেও তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি রয়েছে।
কলকাতার বেথুন স্কুল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮৯ সালে অবসর নেন।
১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নাচোল অঞ্চলে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। ভূমিহীন ও বর্গাচাষি, সাঁওতালসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দরিদ্র কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদারি প্রথার বিলোপ ও ফসলের ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ আন্দোলনের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আদালতে তিনি ঐতিহাসিক জবানবন্দি দেন।
১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহী কারাগারে বন্দী ছিলেন তিনি। পরে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। নাচোল আন্দোলনে পুলিশ হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ভারতে থেকেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে চারবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন ইলা মিত্র। ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সালে বিধানসভায় কমিউনিস্ট দলের উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন একাধিকবার। নারী অধিকার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনেও ভূমিকা রাখেন তিনি।
খেলাধুলায়ও কৃতিত্ব ছিল ইলা মিত্রের। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন হন। বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টলেও দক্ষ ছিলেন। ১৯৪০ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ওই আসর অনুষ্ঠিত হয়নি।
ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি সংরক্ষণের দাবিতে ২০১১ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন শুরু হয়। ঝিনাইদহ, শৈলকুপা ও ঢাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে বাড়িটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে তালিকাভুক্ত ও গেজেটভুক্ত হলেও বাস্তবে সংরক্ষণের কাজ এগোয়নি।
ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান মিল্টন বলেন, ‘প্রায় আড়াই দশক ধরে ইলা মিত্রের ভিটাবাড়ি রক্ষার আন্দোলন করছি। এখন পর্যন্ত বাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও গাফিলতির কারণে কাজটি থমকে আছে। গেজেট প্রকাশের এত বছর পরও সেখানে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। বাড়িটির কারুকাজ ও সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।’
কমরেড ইলা মিত্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুজন বিপ্লব বলেন, বাড়িটির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার অভিযোগ, দেশভাগের পর ইলা মিত্রের পরিবারের সদস্যরা কলকাতায় স্থায়ী হলে বাড়ি ও জমি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দলিলের ভিত্তিতে বর্তমান বাসিন্দারা মালিকানা দাবি করছেন। ১৯৭০ সালে দলিল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সুজন বিপ্লব বলেন, ‘নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারকে অবিলম্বে এটি দখলমুক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।’ বাড়িতে গেলে দর্শনার্থীদের গালিগালাজ করা হয় এবং প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু বলেন, সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ে ইলা মিত্রের ছবি থাকলেও তার স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। পৈতৃক বাড়িতে তার রাজনৈতিক জীবন, কৃষক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে গবেষণাগার বা সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
আবু তোয়াব অপু বলেন, ‘বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখনো সেখানে গিয়ে আমরা শ্রদ্ধা জানাতে পারি না। ইলা মিত্রের রাজনৈতিক জীবন ও কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তার পৈতৃক নিবাস সংরক্ষণ করা জরুরি।’
ঝিনাইদহের সাংস্কৃতিক কর্মী শারমিন জোয়ার্দ্দার বলেন, ইলা মিত্র নারীর অগ্রণী ভূমিকা ও সমাজের মুক্তির সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। তার বাস্তুভিটা সংরক্ষণে ব্যর্থতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক স্মৃতি হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বাড়িটি রক্ষায় সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগ কামনা করেন।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ইলা মিত্রের বাড়ি সংরক্ষণের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। এ বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।
ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে স্থানীয়ভাবে কোনো আয়োজন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখবেন তিনি।
শৈলকুপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণার পর বাড়িটির দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। জমি অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে অধিদপ্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তার জানা নেই।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালে গেজেট প্রকাশের পরও বাড়িটি সেভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অধিদপ্তর নিয়মিত দেখাশোনা করছে। বাড়িটি সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়ার আশা করছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘বাড়িটিতে বেদখলের সমস্যাও রয়েছে। এগুলো দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দ্রুত ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি সংরক্ষণ ও সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ইলা মিত্র ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর মারা যান। তার জন্মশতবার্ষিকীতে এসেও পৈতৃক বাড়িটি সংরক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে। দুই যুগ ধরে আন্দোলন, সরকারি গেজেট এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আশ্বাসের পরও বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
জমি অধিগ্রহণ, বর্তমান বাসিন্দাদের পুনর্বাসন এবং বাড়িটির সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে শুধু একটি পুরোনো বাড়িই নয়, নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতি ও সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণের সুযোগও সংকুচিত হবে।



