তানভীর রায়হান:
দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ঘাটতিও রয়েছে। এর মধ্যেই বিদেশ থেকে নিষিদ্ধ ই-বর্জ্য আমদানির তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় সাত লাখ ডলার ব্যয়ে দেশে ১৪ হাজার ৯৮৫ টন ই-বর্জ্য আমদানি করা হয়েছে। অথচ দেশের ফেলে দেওয়া ইলেকট্রনিক পণ্য থেকেই প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি ডলার মূল্যের মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় উঠে আসা এ চিত্র ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা, নজরদারি ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার ঘাটতিকে সামনে এনেছে। গবেষণা অনুযায়ী, আমদানি করা ই-বর্জ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে বস্ত্রকলের যন্ত্রপাতির খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এসব বর্জ্য আমদানি করা হয়।
দেশের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিধিমালা ও আমদানি নীতি অনুযায়ী এ ধরনের বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ। তবে স্ক্র্যাপের চালানের সঙ্গে ই-বর্জ্য মিশে থাকলে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় স্ক্র্যাপ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। ফলে স্ক্র্যাপ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আনা চালানে ই-বর্জ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে ভুল বা বিভ্রান্তিকর বিবরণ দিয়ে আমদানি করা চালান আটকাতে কাস্টমস কর্মকর্তারা সতর্ক রয়েছেন।
টিআইবি ভুল ঘোষণায় ই-বর্জ্য আমদানি শনাক্ত করতে উন্নত স্ক্যানিং যন্ত্রপাতি ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছে।
বিদেশ থেকে ই-বর্জ্য আমদানির পাশাপাশি দেশে উৎপন্ন বর্জ্যের বড় অংশও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসছে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
২০১৮ সালে দেশে প্রায় চার লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। সে সময় বর্জ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছিল। গবেষণাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে বছরে ই-বর্জ্য উৎপাদন ৪৬ লাখ ২০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাণিজ্যিকভাবে ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৬টি। এর মধ্যে ১৪টি ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় এবং দুটি চট্টগ্রামে অবস্থিত।
সাভারের জেআর রিসাইক্লিং সলিউশনের মালিক এম এ হোসেন বলেন, পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে একটি ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে প্রায় ২২টি লাইসেন্স ও অনুমোদন নিতে হয়।
তাঁর ভাষ্য, তাঁদের কারখানায় ই-বর্জ্য থেকে তামা ও পিতলসহ বিভিন্ন ধাতু পুনরুদ্ধার করা হলেও সোনা উত্তোলনের প্রযুক্তি নেই। এ প্রযুক্তি স্থাপনে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।
বুয়েটের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গবেষণায় দেখা গেছে, এক টন পরিত্যক্ত র্যাম থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ গ্রাম সোনা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ প্রক্রিয়ায় ই-বর্জ্য থেকে ৯৯ শতাংশের বেশি তামা, ৯৪ শতাংশের বেশি রুপা এবং প্রায় ৮৬ শতাংশ টিন পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু দেশে এ ধরনের ধাতু বড় পরিসরে উত্তোলনের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সীমিত। ফলে মূল্যবান যন্ত্রাংশের একটি অংশ বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে। এম এ হোসেন জানান, সোনা পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তি না থাকায় তাঁরা মাদারবোর্ড জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি করেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় চার হাজার ৪০ টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডের স্ক্র্যাপ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ দেশে উৎপন্ন বর্জ্য থেকে মূল্যবান উপাদান উদ্ধারের সক্ষমতা সীমিত থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সম্পদ পুনরুদ্ধারেও ঘাটতি রয়ে গেছে।
দেশের ই-বর্জ্যের বড় অংশ সংগ্রহ ও বাছাই করে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীরা। ঢাকার নিমতলী, এলিফ্যান্ট রোড, মোহাম্মদপুর ও টঙ্গী এবং চট্টগ্রামের আইস ফ্যাক্টরি রোড এ ধরনের কার্যক্রমের পরিচিত কেন্দ্র। এসব কার্যক্রম বহু মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না।
ই-বর্জ্য থেকে ধাতু সংগ্রহে তার পোড়ানো ও অ্যাসিড ব্যবহারের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। টিআইবির গবেষণায় কিছু প্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করার তথ্য উঠে এসেছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বুয়েটের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্রোমিয়াম ও সিসার সংস্পর্শে শ্রমিকদের ক্যানসার ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। স্ক্র্যাপ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আশপাশের পানিতে সিসার দূষণও স্থানীয় বাসিন্দাদের, বিশেষ করে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ২০২১ সালে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও উৎপাদক, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার কাঠামো কার্যকর হয়নি বলে টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিধিমালায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নীতির আওতায় প্রথম বছরে ১০ শতাংশ ই-বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যা পঞ্চম বছরে ৫০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা। কিন্তু এ কাঠামোর আওতায় কোনো বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদক, আমদানিকারক বা পরিবেশক প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধন করেনি বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়নবিষয়ক সমন্বয়ক নাবিল হক বলেন, বিদ্যমান বিধিমালায় সব ধরনের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান নেই। এ কারণে বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিধিমালা প্রণয়নের পরও সরকার ই-বর্জ্যের পরিমাণ ও ধরন নিয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পারেনি। নির্ধারিত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন এবং নিষিদ্ধ ই-বর্জ্য আমদানি বন্ধেও ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মো. মাহবুব জামিল জানান, বিপজ্জনক কঠিন ও তরল বর্জ্য পর্যবেক্ষণে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। যৌথ তদারকি দল ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরিদর্শন শুরু করেছে। নমুনা সংগ্রহ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশগত বিধি মানার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। পরিদর্শন শেষে সুপারিশসহ সমন্বিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি পর্যায়েও কিছু উদ্যোগ রয়েছে। ওয়ালটন গ্রুপের পরিবেশ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রাজু জানান, প্রতিষ্ঠানটির ৭০০টি প্লাজা আউটলেটের মাধ্যমে পুরোনো পণ্য বদলে নতুন পণ্য কেনার অফারে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করা হয়। ২০২৫ সালে এ ব্যবস্থায় এসি, টেলিভিশন ও রেফ্রিজারেটরসহ ৬৬ হাজার ৭২২টি পুরোনো পণ্য সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন উৎপাদক ও আমদানিকারকদের পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয় বহন এবং আনুষ্ঠানিক খাতকে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। টিআইবিও বিধিমালা সংস্কার, জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি, কাস্টমসের নজরদারি বাড়ানো এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-বর্জ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের ভেতরে বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তা না হলে একদিকে বিপুল সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও কমবে না।



