বিশেষ প্রতিনিধি:
সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলে নয়; বরং শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ ও জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকবেন—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। আধুনিক বাহিনী গড়ে তুলতে অস্ত্র ও সরঞ্জামের পাশাপাশি সদস্যদের দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধের ধরন ও কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এ বাস্তবতায় দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি সময়োপযোগী করার কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাসদস্যদের সশস্ত্র প্রতিরোধ স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগ ও জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জাতীয় পে স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। সাভার সেনানিবাসে ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা পাওয়া ইউনিটগুলোর সদস্যদের এ সম্মানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি ইউনিটের জন্য জাতীয় পতাকা শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; এটি তার ঐতিহ্য, বীরত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের আস্থা, স্বীকৃতি ও সম্মান প্রকাশ পায়।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সেনাসদস্য এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।



