Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়সুশীলদের ঘুম ভাঙে, কখন, কেন এবং কার জন্য?

সুশীলদের ঘুম ভাঙে, কখন, কেন এবং কার জন্য?

বিবৃতি দেওয়া অপরাধ নয়; কিন্তু বিবৃতিরও কি কোনো স্মৃতিশক্তি থাকা উচিত নয়?

তানভীর রায়হান:

বাংলাদেশে ‘সুশীল সমাজ’ একটি অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান। এর কোনো নিবন্ধিত কার্যালয় নেই, কোনো নির্বাচিত কমিটি নেই, কোনো সদস্যপদ ফরম নেই। তবু প্রয়োজনের সময় তাঁরা দলবদ্ধ হন, বিবৃতি দেন, সংবাদ সম্মেলন করেন এবং জাতিকে জানান—তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

জাতিও উদ্বিগ্ন হয়। তবে কখনো কখনো আরেকটি প্রশ্নও করে, আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন?

এই প্রশ্নটি অবশ্য অশোভন। কারণ সুশীলদের প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু সুশীলদের প্রশ্ন করা যাবে না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন একটি অলিখিত নিয়ম যেন তৈরি হয়ে গেছে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ জানিয়েছেন। আরেকটি ঘটনায় একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও বই বিক্রিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও প্রতিবাদ করেছেন অনেকে।

অন্যায় হলে প্রতিবাদ অবশ্যই হওয়া উচিত। বরং আরও বেশি হওয়া উচিত।

কিন্তু সমস্যা প্রতিবাদে নয়। সমস্যা হলো প্রতিবাদের স্মৃতিশক্তিতে।

কোনো একটি সরকার ক্ষমতায় এলে যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাইক্রোফোন হঠাৎ খুব ভালো কাজ করতে শুরু করে, আর অন্য সময়ে সেই মাইক্রোফোনে মরিচা পড়ে—তাহলে সাধারণ মানুষ একটু সন্দেহ করতেই পারে।

একটি দেশে দখল হয়েছে, তখন বিবৃতি নেই। হামলা হয়েছে, তখন বিবৃতি নেই। ভাঙচুর হয়েছে, তখন বিবৃতি নেই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছে, তখনও নীরবতা।

তারপর নতুন সরকার এসেছে।

হঠাৎ দেখা গেল, বিবৃতি প্রস্তুত।

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, অন্যায় কি সরকারের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়? নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের বিবেকের সংবেদনশীলতাও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়?

এটি অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার প্রশ্ন নয়। বরং একটি বৃহত্তর নাগরিক প্রশ্ন।

যদি অন্যায় অন্যায়ই হয়, তাহলে সরকারের নাম বদলালে প্রতিবাদের ভাষা বদলাবে কেন?

সুশীল সমাজের শক্তি আসলে এখানেই, তারা যদি সত্যিই কোনো দল বা সরকারের অংশ না হন, তাহলে তাদের মানদণ্ডও সবার জন্য একই হওয়ার কথা।

বিএনপি করলে অন্যায়, আওয়ামী লীগ করলে অন্যায় নয়—এমন হতে পারে না। জামায়াত করলে অন্যায়, অন্য কেউ করলে ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’, এমনও হতে পারে না।

অন্যায়কে দলীয় পরিচয় দিয়ে মাপতে শুরু করলে সুশীলতা আর সুশীলতা থাকে না; সেটি হয়ে যায় রাজনৈতিক পছন্দের আরেকটি সংস্করণ।

কেউ যখন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, তখন তার জবাবে বলা হয়, আগের সরকারের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?

এই প্রশ্নটি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এরও একটি সীমা আছে।

কারণ কেউ গতকাল অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি বলে আজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার হারিয়ে ফেলেন না।

অতএব ‘তখন কোথায় ছিলেন’ প্রশ্নটি প্রতিবাদ বন্ধ করার অস্ত্র নয়; বরং জবাবদিহির প্রশ্ন হওয়া উচিত।

সুশীল সমাজকে তাই জিজ্ঞাসা করা দরকার—আপনারা আগে কেন বলেননি?

আবার সরকারকেও জিজ্ঞাসা করা দরকার—এখন কেন অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছেন না?

দুই প্রশ্নের উত্তরই দরকার।

সুশীল সমাজকে আমরা প্রায়ই ‘জাতির বিবেক’ বলে থাকি। কিন্তু বিবেকেরও তো আয়না দরকার।

জাতির বিবেক যদি নিজের অতীত না দেখে, তাহলে সেটি বিবেকের চেয়ে বেশি কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।

কোনো বিবৃতিতে ৩০ জন স্বাক্ষর করলেন, ৪০ জন স্বাক্ষর করলেন—সংখ্যা যত বাড়ে, সংবাদমূল্যও বাড়ে। কিন্তু স্বাক্ষরের সংখ্যা সত্যতার প্রমাণ নয়।

৪০ জন মানুষ কোনো একটি বিষয়ে একমত হলেই ঘটনাটি সত্য হয়ে যায় না। আবার একজন মাত্র মানুষ অভিযোগ তুললে সেটিও মিথ্যা হয়ে যায় না।

সত্য নির্ধারণ করবে তদন্ত, নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ, আদালত এবং স্বাধীন যাচাই।

সুতরাং সুশীলদের বিবৃতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু বিবৃতিই শেষ কথা নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় এক-এগারো একটি স্থায়ী ভূত।

কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই এক-এগারো। কেউ রাজনৈতিক সংকটের কথা বললেই এক-এগারো। কেউ নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই আবার এক-এগারো।

এ যেন এমন এক রাজনৈতিক ভূত, যার কাজ হলো অতীত থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানের প্রতিটি বিতর্কে বসে পড়া।

২০০৬-০৭ সালের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে রাজনৈতিক সংঘাত ছিল, সাংবিধানিক সংকট ছিল, নির্বাচন নিয়ে বিরোধ ছিল, সহিংসতা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে একটি শক্তিশালী অরাজনৈতিক শাসন কাঠামো তৈরি হয়েছিল।

এসব থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

কিন্তু আজ কেউ একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হামলার তদন্ত দাবি করলেই সেটিকে এক-এগারোর নীলনকশা বলা হলে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হয় না।

এক-এগারো যদি সত্যিই ফিরতে হয়, তার জন্য শুধু কয়েকটি বিবৃতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট।

অতীতের ছায়া দিয়ে বর্তমানকে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু রাজনীতি বিশ্লেষণ করা এত সহজ নয়।

সরকারেরও উচিত নয়, কেউ সমালোচনা করলেই তাকে ষড়যন্ত্রকারী বানিয়ে দেওয়া।

এটি সবচেয়ে সহজ রাজনৈতিক কৌশল। কারণ এতে অভিযোগের উত্তর দিতে হয় না।

কেউ বলল, দখল হচ্ছে।

উত্তর: ষড়যন্ত্র।

কেউ বলল, চাঁদাবাজি হচ্ছে।

উত্তর: রাজনৈতিক অপপ্রচার।

কেউ বলল, হামলা হয়েছে।

উত্তর: সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা।

এভাবে চলতে থাকলে একসময় সরকার বাস্তব সমস্যার সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পার্থক্যই হারিয়ে ফেলতে পারে।

বরং সরকার বলুক—অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেব, মিথ্যা হলে তদন্তে তা প্রমাণিত হবে।

এই একটি বাক্যই অনেক রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে।

আপনারা যদি সত্যিই রাষ্ট্রের বিবেক হন, তাহলে একটু ধারাবাহিক হন।

সরকার বদলালে বিবেকের রং বদলাবেন না।

ক্ষমতাবান বদলালে নৈতিকতার সংজ্ঞা বদলাবেন না।

যে দখল আগের সরকারের সময়ে অন্যায় ছিল, বর্তমান সরকারের সময়ে সেটিও অন্যায়।

যে হামলা তখন নিন্দনীয় ছিল, এখনো নিন্দনীয়।

যে চাঁদাবাজি তখন অপরাধ ছিল, এখনো অপরাধ।

যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

আর কোনো বই বিক্রি বন্ধ করার চেষ্টা যদি বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে প্রতিবাদ করুন। কিন্তু একইভাবে কোনো বই, স্মৃতিস্তম্ভ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর হামলা হলেও প্রতিবাদ করুন।

বেছে বেছে নৈতিকতা চর্চা করলে নৈতিকতার বাজারদর হয়তো থাকে, বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ বোকা নয়।

তারা দেখেছে বহু সরকার এসেছে, গেছে। দেখেছে ক্ষমতাবানদের ভাষা বদলেছে। দেখেছে বিরোধীরা ক্ষমতায় গিয়ে অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের মতোই আচরণ করেছে। দেখেছে প্রতিবাদীরাও কখনো কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে নীরব হয়েছে।

তাই এখন মানুষ শুধু বিবৃতি শুনতে চায় না।

তারা জানতে চায়, বিবৃতির পর কী হলো?

তদন্ত হলো কি?

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হলো কি?

ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেল কি?

প্রশাসন কাজ করল কি?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যে নৈতিক মানদণ্ড দিয়ে আজ অন্যকে বিচার করা হচ্ছে, আগামীকাল নিজের পছন্দের সরকার বা রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেও কি সেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে?

সুশীল সমাজ মাঠে নামুক। অবশ্যই নামুক।

প্রতিবাদ করুক। আরও বেশি করুক।

কিন্তু এমনভাবে করুক, যাতে মানুষ তাদের দেখে না বলে, ‘ওরা কার বিরুদ্ধে বলছে?’

বরং বলে, ‘ওরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলছে।’

এই পার্থক্যটুকুই আসলে সুশীল সমাজের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কারণ জাতির বিবেকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার কণ্ঠের উচ্চতা নয়, তার নৈতিকতার ধারাবাহিকতা।

-গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments