লাইফস্টাইল ডেস্ক:
মাঝেমধ্যে গলা পরিষ্কার করা স্বাভাবিক। ঘুম থেকে ওঠার পর, খাবার খাওয়ার পর কিংবা দীর্ঘ সময় কথা বলার পর গলায় অস্বস্তি অনুভূত হলে এমনটা হতে পারে। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান অসুস্থতা না থাকলেও যদি দিনের পর দিন বারবার গলা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, শ্লেষ্মা জমার মতো লাগা কিংবা কণ্ঠে অস্বস্তির পেছনে রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি, নাকের শ্লেষ্মা গলার পেছনে নামা, পুরোনো সংক্রমণের প্রভাব কিংবা অতিরিক্ত কণ্ঠস্বর ব্যবহারের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল সমস্যা সেরে যাওয়ার পরও গলা পরিষ্কার করার অভ্যাসটি থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই তৈরি হতে পারে একটি পুনরাবৃত্ত চক্র। গলায় অস্বস্তি থেকে গলা পরিষ্কার করার তাগিদ তৈরি হয়। বারবার গলা পরিষ্কার করার ফলে টিস্যুতে আরও জ্বালা বা সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। সেই অস্বস্তি আবার গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।
বারবার গলা পরিষ্কার করার অন্যতম সম্ভাব্য কারণ ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জিয়াল রিফ্লাক্স বা ‘সাইলেন্ট রিফ্লাক্স’। এ ক্ষেত্রে পাকস্থলীর উপাদান গলা বা স্বরযন্ত্রের দিকে উঠে আসতে পারে। সাধারণ অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো এতে সবসময় বুকজ্বালা নাও থাকতে পারে।
গলা পরিষ্কার করা, কাশি, স্বরভঙ্গ বা গলায় কিছু জমে থাকার অনুভূতি এ ধরনের সমস্যার সঙ্গে দেখা যেতে পারে। তবে গলার এসব উপসর্গ দেখা দিলেই যে রিফ্লাক্স রয়েছে, তা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের Alimentary Pharmacology & Therapeutics-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জিয়াল রিফ্লাক্স শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কারণ এর অনেক উপসর্গ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা বা গলার অতিসংবেদনশীলতার সঙ্গেও মিলে যায়। তাই শুধু গলা পরিষ্কার করার প্রবণতার ভিত্তিতে রিফ্লাক্সের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
অ্যালার্জি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী নাকের প্রদাহের কারণে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি হয়ে তা গলার পেছনে নেমে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে পোস্টন্যাসাল ড্রিপ বলা হয়।
এ সময় অনেকের মনে হতে পারে, গলায় কিছু আটকে আছে বা বারবার সেটি পরিষ্কার করা দরকার। ফলে অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করতে গিয়ে গলা পরিষ্কার করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
সর্দি-কাশি বা অন্য কোনো ভাইরাল সংক্রমণের পর গলার অস্বস্তি কিছুদিন থেকে যেতে পারে। সংক্রমণটি সেরে গেলেও গলার টিস্যু ও স্নায়ু কিছু সময় বেশি সংবেদনশীল থাকতে পারে।
এ অবস্থায় মূল অসুস্থতা আর না থাকলেও গলা পরিষ্কার করার তাগিদ অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ, যে কারণে প্রথমে সমস্যা শুরু হয়েছিল সেটি চলে যাওয়ার পরও অভ্যাস বা সংবেদনশীলতার কারণে উপসর্গ টিকে থাকতে পারে।
যাদের পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় কথা বলতে হয়, নিয়মিত গান করতে হয় কিংবা কণ্ঠস্বরের ওপর বেশি চাপ পড়ে, তাদের গলায় অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কণ্ঠের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে গলা পরিষ্কার করার প্রবণতারও সম্পর্ক থাকতে পারে।
২০২৪ সালের Journal of Voice-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঘন ঘন কণ্ঠনালীর সমস্যার কথা বলা ব্যক্তিদের কিছু পুনরাবৃত্ত দৈনন্দিন আচরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব আচরণ গলার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তাই শুধু কণ্ঠকে বিশ্রাম দেওয়ার পরামর্শের পাশাপাশি দৈনন্দিন কণ্ঠ ব্যবহারের অভ্যাসও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু মানুষের গলায় কোনো পিণ্ড বা বস্তু আটকে আছে বলে মনে হয়, যদিও বাস্তবে সেখানে কোনো বাধা থাকে না। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘গ্লোবাস সেনসেশন’।
রিফ্লাক্স, গলার পেশিতে টান কিংবা ওই অঞ্চলের সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি থেকেই অনেকে বারবার গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা সবসময় অস্বস্তি কমায় না। বরং ঘন ঘন এ কাজ করলে স্বরযন্ত্রের আশপাশের টিস্যুতে বারবার চাপ পড়তে পারে।
ফলে সাময়িকভাবে স্বস্তি পেলেও পরবর্তী সময়ে গলায় আরও অস্বস্তি বা সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। তখন আবার গলা পরিষ্কার করার তাগিদ আসে। এভাবে তৈরি হয় একটি চক্র, অস্বস্তি, গলা পরিষ্কার করার ইচ্ছা, গলা পরিষ্কার করা, আরও অস্বস্তি এবং পুনরায় একই তাগিদ।
কখনও কখনও এই অবস্থাকে ল্যারিঞ্জিয়াল হাইপারসেনসিটিভিটি বা স্বরযন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে বারবার গলা পরিষ্কার করার অনুভূতিকে শুধু মানসিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে দীর্ঘদিন ধরে গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা থাকলে এর পেছনের কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি, দীর্ঘস্থায়ী নাকের সমস্যা, কণ্ঠনালীর সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ রয়েছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা যেতে পারে।


